ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার মরিয়া চেষ্টা চলছে। উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানী কারাকাস ও এর আশপাশের এলাকায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পের পর ১৭২ জন এখনো ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়ে আছেন। ভূমিকম্পে ১ হাজার ৪৩০ জন মারা গেছেন এবং ৩ হাজার ২৩৮ জন আহত হয়েছেন। ভূমিকম্পের পর থেকে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

উদ্ধারকাজ চলাকালে গত শুক্রবার আবার ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প আঘাত হানে। ৪ দশমিক ৯ তীব্রতা তুলনামূলক মৃদু এ ভূকম্পন রাজধানী কারাকাস এবং কাছাকাছি মারাকাই শহরে অনুভূত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে লা গুইরা রাজ্যে ভারী যন্ত্রপাতির অভাব এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সীমিত উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকেরা হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

২৫ বছর বয়সী জেনিফার পালাসিওস জানান, লা গুইরা শহরের আটটি টাওয়ারবিশিষ্ট ‘হুগো চাভেজ’ আবাসন কমপ্লেক্সের নিচে তাঁর ৬ বছর বয়সী ছেলে এবং আরও পাঁচজন আত্মীয় এখনো চাপা পড়ে আছেন। তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় মানুষই নিজ উদ্যোগে আটকে পড়া মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছে। কংক্রিটের স্ল্যাবগুলো সরানোর জন্য আমাদের ক্রেন দরকার। ভেতরে এখনো মানুষ আটকে আছেন।’

এই বিপর্যয় দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত নিকোলা মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও রদ্রিগেজ নিজেকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দূত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছিলেন।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, বুধবারের ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ তীব্রতার জোড়া ভূমিকম্পের কারণে প্রায় ৬৭০ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি ছিল এক শতাব্দীর বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন।

ভূমিকম্পে ফেটে চৌচির হওয়া মহাসড়ক ধরে যাওয়ার সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখতে পান, একের পর এক ভবন ভেঙে কংক্রিট আর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া রডের স্তূপে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকারীদের সুবিধার্থে কিছু ধ্বংসস্তূপের ওপর স্প্রে-পেইন্ট দিয়ে ভবনের নাম লিখে রাখা হয়েছে।

কারাকাস ও ভ্যালেন্সিয়া থেকে মোটরসাইকেলে করে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা।

শুরুতে স্বেচ্ছাসেবকদের ধন্যবাদ জানালেও পরে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ ও অন্যান্য কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে লা গুইরা শহরে যেতে নিষেধ করেন। তাঁরা জানান, রাস্তায় ভিড়ের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘোষণা দেওয়া হয়, সরকারি ও নিবন্ধিত উদ্ধারকারী দল ছাড়া অন্য সবার জন্য রাত আটটা থেকে সব রাস্তা বন্ধ থাকবে।

লা গুইরার কাতিয়া লা মার শহরের একটি ক্ষতিগ্রস্ত দোকান থেকে স্থানীয় মানুষকে টয়লেট পেপার, রান্নার তেল, রুটিসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যেতে দেখেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে পুলিশ, ন্যাশনাল গার্ড বা অন্য কোনো কর্মকর্তাকে এই লুটপাট ঠেকাতে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতা নেন রদ্রিগেজ। তিনি দুর্গতদের জন্য বড় ধরনের ত্রাণসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার তেলমন্ত্রী পলা হেনাও বলেন, ভূমিকম্পে দেশের তেল উৎপাদনে কোনো প্রভাব পড়েনি। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখারও আশ্বাস দেন তিনি।

তেল খাতের কর্মকর্তা ও শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, এই শিল্পের বড় কোনো অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক থাকা কিছু দেশসহ বিভিন্ন বিদেশি উদ্ধারকারী দল বৃহস্পতি ও শুক্রবার থেকে পৌঁছাতে শুরু করেছে। শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন রদ্রিগেজ। এর আগে তিনি এবং অন্য কর্মকর্তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর নর্দার্ন কমান্ড ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ১৫ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনী

দুটি জাহাজ পাঠিয়েছে এবং উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য হেলিকপ্টার ও বিমান মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছে।