ব্ল্যাকহোল (কৃষ্ণগহ্বর) থেকে কোনো তথ্য বা আলো কখনোই বেরিয়ে আসতে পারে না। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে ব্ল্যাকহোল মানেই রহস্য। তবে সম্প্রতি মহাবিশ্বের গভীর থেকে ধেয়ে আসা রহস্যময় একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের দাবি, প্রথমবারের মতো এমন একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেটি নতুন তৈরি হওয়া ব্ল্যাকহোলের চারপাশে থাকা অদৃশ্য সীমানা বা ইভেন্ট হরাইজন থেকে সংকেত বহন করে এনেছে।
ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন এমন এক অদৃশ্য সীমানা, যা পার হলে তীব্র মহাকর্ষের কারণে আলোসহ কোনো কিছুই আর বাইরে ফিরতে পারে না। একে পয়েন্ট অব নো রিটার্ন বলা হয়। ইভেন্ট হরাইজনকে জলপ্রপাতের প্রান্তসীমার সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি নৌকা জলপ্রপাতের প্রান্তের যত কাছেই থাকুক, জোরে দাঁড় টেনে ফিরে আসতে পারবে; কিন্তু নৌকাটি যদি একবার প্রান্তসীমা বা লাইন পার হয়ে যায়, তবে স্রোতের টানে তার নিচে পড়ে যাওয়া নিশ্চিত; আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করছিলেন, ডিরেক্ট ওয়েভ বা প্রত্যক্ষ তরঙ্গ নামের এক বিশেষ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ইভেন্ট হরাইজনের তথ্য বহন করতে পারে। অবশেষে ২০২৬ সালে এসে বিজ্ঞানীরা সেই তরঙ্গের অস্তিত্ব নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হলেন। বিষয়টি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো শোনালেও এখন তা এক পরম বাস্তব।
কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী সিজেং মা বলেন, ‘ইভেন্ট হরাইজন এমন কিছু নয়, যা আমরা আলোর সাহায্যে সরাসরি দেখতে পাব। কারণ, সংজ্ঞা অনুযায়ী সেখান থেকে কিছুই পালাতে পারে না। তবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আমাদের একটি ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। যখন দুটি ব্ল্যাকহোল একে অপরকে প্রদক্ষিণ করে এবং মিলেমিশে এক হয়ে যায়, তখন প্রচণ্ড সংঘর্ষের ফলে চূড়ান্ত ব্ল্যাকহোলের দিগন্তের খুব কাছের স্থান-কাল মারাত্মকভাবে আন্দোলিত হয়। সেই কম্পনের কিছু অংশ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হিসেবে বাইরে ভ্রমণ করতে পারে এবং আমাদের কাছে পৌঁছায়।’
মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেতগুলো কতটা সূক্ষ্ম, তা কল্পনা করাও কঠিন। মহাবিশ্বের কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে যাত্রা শুরু করে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেতগুলো যখন পৃথিবীতে পৌঁছায়, তখন তা স্থান-কালকে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চেয়েও কম ব্যাস পরিমাণে সংকুচিত ও প্রসারিত করে থাকে। এত সূক্ষ্ম তথ্য থেকে এই সরাসরি শব্দতরঙ্গ খুঁজে পাওয়ার জন্য বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন ছিল বড় ধরনের মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সিগন্যাল। আর সেই কাঙ্ক্ষিত তরঙ্গটি এসেছে জিডাব্লিউ২৫০১১৪ নামক ইভেন্ট হরাইজন থেকে, যা এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে জোরালো এবং পরিষ্কার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সিগন্যাল। শুরুতে বিজ্ঞানীরা তথ্য বিশ্লেষণের সময় কিছুটা সতর্ক ও সন্দিহান ছিলেন। কারণ, ভুল সংকেত আসার ঝুঁকি সব সময়ই থাকে। কিন্তু প্রাথমিক পরীক্ষার পর দেখা গেছে, তথ্যগুলো ঠিক তাত্ত্বিক মডেলের মতোই আচরণ করছে। শুধু তা–ই নয়, তরঙ্গটির বিবর্তন আমাদের তাত্ত্বিক মডেল থেকে গণনা করা ডিরেক্ট-ওয়েভ সিগনেচারের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে।
বিজ্ঞানীদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার যদি অন্য সব পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়, তবে তা ব্ল্যাকহোল অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন দুয়ার খুলে দেবে। এই ডিরেক্ট-ওয়েভ সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে এখন পরিমাপ করা সম্ভব হবে যে ইভেন্ট হরাইজন ঠিক কত দ্রুত ঘুরছে এবং এর মাধ্যাকর্ষণ কত দ্রুত তথ্যকে গ্রাস করে বিলীন করে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এত দিন ধরে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সূত্রে ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন সম্পর্কে সুন্দর গাণিতিক বর্ণনা ছিল, যা এখন সরাসরি পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট






