ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলে গতকাল বুধবার এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে অনেক ভবন ধসে পড়েছে এবং আতঙ্কিত মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস সতর্ক করে বলেছে, দুটি ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশজুড়ে উদ্ধারকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩২ জন নিহত হওয়ার কথা ভেনেজুয়েলা সরকার নিশ্চিত করেছে।

এমন এক সময়ে এই দুর্যোগ আঘাত হানল, যখন ভেনেজুয়েলা গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন বাহিনীর হাতে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো আটক হওয়ার পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। কয়েক বছরের লাগামহীন মূল্যস্ফীতিতে দেশটির অর্থনীতিও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

.

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভেনেজুয়েলার ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সান ফেলিপের কাছে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর আরও শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। এই এলাকায় দেশের কয়েকটি বৃহৎ তেল শোধনাগার রয়েছে।

গতকাল ভেনেজুয়েলায় সরকারি ছুটির দিন ছিল। সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট দিবস এবং স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের স্মরণে দিনটি পালন করা হচ্ছিল। ফলে অনেক মানুষ বাড়িতে অথবা বিভিন্ন জনসমাগমে উপস্থিত ছিলেন।

ভূমিকম্প এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এর কম্পন দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অনুভূত হয়। এমনকি উৎপত্তিস্থল থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরের প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়াতেও কম্পন টের পাওয়া গেছে।

ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী কারাকাসে আলতামিরা স্কয়ারের কাছের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় অন্তত তিনটি ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়েছে।

.

সিএনএনের যাচাই করা একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, কারাকাস, উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মারসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবন ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ের ঢালে কয়েকটি ভবন ধসে পড়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।

আতঙ্কিত বাসিন্দাদের পরিবার ও পোষা প্রাণী নিয়ে ভবন থেকে বের হয়ে রাস্তায় জড়ো হতে দেখা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন থেকে বেরিয়ে আসা কারাকাসের এক বাসিন্দা বলেন, পুরো দৃশ্য যেন কোনো ভৌতিক চলচ্চিত্রের মতো ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে সুনামির কোনো হুমকি নেই। এর আগে পুয়ের্তো রিকো, ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে উপকূলীয় এলাকাগুলোর জন্য জারি করা সুনামি সতর্কতা পরে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

.

নিকোলা মাদুরো আটক হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়া দেলসি রদ্রিগেজ গতকাল রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানিয়েছেন। তবে কতজন মারা গেছেন, সে বিষয়ে কোনো সংখ্যা জানাননি।

পরপর দুটি ভূমিকম্পের ঘটনায় ইউএসজিএস তাদের পেজার ব্যবস্থার মাধ্যমে দুটি পৃথক জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। এতে দুর্যোগের ভয়াবহতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। অতীতে ইউএসজিএস সাধারণত বছরে একবার বা দুবার এমন সতর্কতা জারি করেছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ব্যাপক প্রাণহানি ও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। দুর্যোগটি বিস্তৃত এলাকায় প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন হয়েছিল।

ইউএসজিএস আরও জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ এমন ভবনে বসবাস করেন, যেগুলো ভূমিকম্পের তীব্র কম্পনে সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

.

দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ তদারকির জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

দেলসি রদ্রিগেজ আরও বলেন, রাজধানী কারাকাসের কাছে সিমন বলিভার বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ থাকবে। রেল যোগাযোগ এবং জরুরি নয় এমন সব কার্যক্রমও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরও অনেক স্থাপনা ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু ভবনে সরাসরি গ্যাস সরবরাহও বন্ধ করার অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

দেলসি রদ্রিগেজ জানান, একাধিক অঙ্গরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান নেটব্লকস জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলাজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

গতকাল সন্ধ্যা থেকেই মেক্সিকো, এল সালভাদর, ব্রাজিল, বলিভিয়াসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ভেনেজুয়েলার প্রতি সংহতি ও সমবেদনার বার্তা আসতে শুরু করে।