মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যান আজ সোমবার মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী আন্দ্রেয়া মিচেলের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পারকিনসন রোগজনিত জটিলতায় নিজ বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

অ্যালান গ্রিনস্প্যান ২০০৬ সালে অবসরের সময় সর্বকালের অন্যতম সেরা ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু অবসরের মাত্র দুই বছর পর শুরু হওয়া ভয়াবহ আর্থিক সংকটের জন্য সমালোচিতও হন তিনি।

অ্যালান গ্রিনস্প্যান ১৯৮৭ সালের আগস্ট থেকে ২০০৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ফেডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেন।

অ্যালান গ্রিনস্প্যানের মৃত্যুর খবর জানিয়ে তাঁর স্ত্রী আন্দ্রেয়া মিচেল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘তিনি ছিলেন এক বিশাল মাপের মানুষ, যিনি উভয় রাজনৈতিক দলের প্রেসিডেন্টদের আমলে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতেও সব সময় সৎ ছিলেন।’

আন্দ্রেয়া মিচেল আরও বলেন, ‘তাঁর মেধা ও মানবিকতার জন্য তাঁকে স্মরণ করা হবে। তাঁর জীবনসঙ্গী হতে পারা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল।’

উইলিয়াম ম্যাকচেসনি মার্টিনের পর দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময় ফেডের চেয়ারম্যান ছিলেন অ্যালান গ্রিনস্প্যান। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ১৯৮৭ সালে প্রথম তাঁকে এই পদে নিয়োগ দেন। পরে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডব্লিউ বুশ তাঁকে পুনর্নিয়োগ করেন।

২০০৬ সালে ৮০ বছর বয়সে ফেড ছাড়ার পর তিনি ‘গ্রিনস্প্যান অ্যাসোসিয়েটস’ নামে নিজস্ব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরামর্শ দিয়ে নতুন কর্মজীবন শুরু করেন।

.

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান

অ্যালান গ্রিনস্প্যানের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দ্বিতীয় দীর্ঘতম অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ঘটে। ১৯৯১ সালের মার্চ থেকে ২০০১ সালের মার্চ পর্যন্ত টানা এক দশক অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় ছিল। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা সত্ত্বেও সুদের হার না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশটির দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে এবং তাঁকে অর্থনীতির ‘মায়েস্ত্রো’ হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি উৎপাদনশীলতার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে—গ্রিনস্প্যানের এই দূরদর্শী মূল্যায়ন তাঁর সময়ের অন্যতম বড় অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। সাবেক ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলও পরবর্তী সময়ে এই উদাহরণ উল্লেখ করে বলেছেন, কখনো কখনো অর্থনৈতিক মডেলের চেয়েও মানবিক বিচারবোধ বেশি কার্যকর হতে পারে।

.
সংগীতই ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা। তিনি নিউইয়র্কের জুলিয়ার্ড স্কুলে দুই বছর ক্ল্যারিনেট শেখেন এবং কিছু সময় একটি সুইং ব্যান্ডে স্যাক্সোফোনও বাজান। পরে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অধ্যয়ন শুরু করেন।
.

তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর মুদ্রানীতির তীব্র সমালোচনা হয়। সমালোচকদের মতে, তাঁর নীতিগুলো বিভিন্ন সম্পদবাজারে বুদ্‌বুদ তৈরি করে এবং ২০০৭-২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

বেসবল পরিসংখ্যানের প্রতি আগ্রহ থেকে গণিতের প্রেমে পড়া গ্রিনস্প্যান দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাস পর ১৯৮৭ সালের ‘ব্ল্যাক মানডে’ শেয়ারবাজার ধস মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে প্রশংসা কুড়ান।

গ্রিনস্প্যান ১৯৯০-৯১ সালের মন্দা, ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় ও রুশ আর্থিক সংকট এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পরিচালনায় সহায়তা করেন।

জীবনীলেখক সেবাস্টিয়ান ম্যালাবির মতে, গ্রিনস্প্যান ছিলেন ওয়াশিংটনের দক্ষ ক্ষমতার খেলোয়াড়। তিনি প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করতে পারতেন, যাতে তাঁরা অনেক সময় বুঝতেও পারতেন না যে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন গ্রিনস্প্যান নিজেই।

.

বুদ্‌বুদের পর

২০০৫ সালে ফেডের জ্যাকসন হোল সম্মেলনে দুই শীর্ষ অর্থনীতিবিদ তাঁকে সম্ভবত সর্বকালের সেরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে অভিহিত করেন।

কিন্তু তাঁর মেয়াদের শেষ চার বছরে গড়ে ওঠা আবাসনমূল্যের বুদ্‌বুদ ফেটে যাওয়ার পর তাঁর উজ্জ্বল সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার অভিঘাত পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।

পরবর্তীকালে ফেড তাঁর উত্তরসূরিদের নেতৃত্বে নতুন পথে হাঁটে। শূন্য সুদের হার, আর্থিক সংকট মোকাবিলার নতুন নীতি, স্বচ্ছ যোগাযোগব্যবস্থা, নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য এবং নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের মতো নানা উদ্যোগ চালু করা হয়।

গ্রিনস্প্যান ছিলেন আর্থিক বাজারে সীমিত নিয়ন্ত্রণের একজন শক্তিশালী সমর্থক। সমালোচকদের মতে, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন বিনিয়োগের বিষয়ে তাঁর উদাসীন মনোভাবও সংকটকে ত্বরান্বিত করেছিল।

পরে গ্রিনস্প্যান স্বীকার করেন, তিনি বিস্মিত হয়েছেন যে ব্যাংকারদের নিজস্ব স্বার্থ তাঁদের এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানকেই বিপদের মুখে ফেলেছে।

২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভসের এক কমিটির সামনে গ্রিনস্প্যান বলেন, ‘আমিসহ যারা মনে করতাম ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব স্বার্থ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করবে, আমরা গভীর বিস্ময় ও অবিশ্বাসের মধ্যে আছি।’

কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নিজেকে রিপাবলিকান হিসেবে পরিচয় দিতে দ্বিধা না করা গ্রিনস্প্যান ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কর কমানোর পরিকল্পনাকে সমর্থন করে তাঁর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তিকে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলেন। যদিও তিনি ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।

.

সংগীত থেকে অর্থনীতিতে

১৯২৬ সালের ৬ মার্চ নিউইয়র্ক শহরে অ্যালান গ্রিনস্প্যান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা–বাবার বিচ্ছেদের পর তিনি মায়ের সঙ্গে ওয়াশিংটস হাইটস এলাকায় বেড়ে ওঠেন।

সংগীতই ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা। তিনি নিউইয়র্কের জুলিয়ার্ড স্কুলে দুই বছর ক্ল্যারিনেট শেখেন এবং কিছু সময় একটি সুইং ব্যান্ডে স্যাক্সোফোনও বাজান। পরে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অধ্যয়ন শুরু করেন।

তরুণ বয়সে তিনি লেখক আয়ন র‍্যান্ডের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আয়ন র‍্যান্ড মুক্তবাজার ও মুনাফার প্রাধান্যের দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন এবং ‘অ্যাটলাস শ্রাগড’ ও ‘দ্য ফাউন্টেনহেড’র মতো বইয়ের জন্য পরিচিত।

ফেডে যোগ দেওয়ার আগে তিনি প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের আমলে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং টাউনসেন্ড-গ্রিনস্প্যান অ্যান্ড কোম্পানি  নামে একটি অর্থনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন।

পল ভলকারের উত্তরসূরি হিসেবে ফেডের দায়িত্ব নেওয়ার সময় অনেকে সন্দেহ করেছিলেন, তিনি হয়তো তাঁর কঠোর ও দৃঢ়চেতা পূর্বসূরির সমকক্ষ হতে পারবেন না।

কিন্তু ১৯৮৭ সালের অক্টোবরের শেয়ারবাজার ধসের পর দ্রুত বাজারে তারল্য সরবরাহ করে তিনি নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেন। অর্থনৈতিক ইতিহাসে এই পদক্ষেপকে এখন আর্থিক সংকট মোকাবিলার একটি পাঠ্যপুস্তকসম উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এর ফলে সম্ভাব্য মন্দা এড়ানো সম্ভব হয়েছিল বলে মনে করা হয়।