ইসলাম মানুষের দৈনিক রুটিন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক নির্দেশনা দিয়েছে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এবং সকালের সোনালি সময়কে কাজে লাগানোর মাধ্যমেই একজন মানুষ তার জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে সর্বোচ্চ সফল হতে পারে।
ইসলামি শরিয়তের আলোকে সময় ব্যবস্থাপনার এমন পাঁচটি মূল নিয়ম নিচে আলোচনা করা হলো।
.ইসলামে সকালের প্রথম প্রহরকে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উৎপাদনশীল সময় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ফজর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়টুকু হলো রিজিক ও বরকত বণ্টনের সময়। এ সময়ে ঘুমিয়ে থাকা অলসতার লক্ষণ এবং এটি মানুষের মেধা ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। (ইমাম ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যাহ, আল-ফাওয়াইদ, /১/৬৮, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৭৩)
রাসুল (সা.) উম্মতের সকালের সময়ের জন্য বিশেষ দোয়া করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমার উম্মতের জন্য তার সকালের সময়ে বরকত দান করুন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২১২)
.অধিকাংশ মানুষ সময়ের পেছনে দৌড়ায়, কিন্তু মুমিন তার সময়কে সাজায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়সূচি অনুযায়ী, যা চমৎকার একটি ‘টাইম-ব্লকিং’ পদ্ধতি।
.ইসলামের আয়নায় পেশা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্কৃতি.দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষকে সময়ের গুরুত্ব শেখায় এবং জীবনের বিশৃঙ্খল রুটিনকে একটি সুনির্দিষ্ট ও পবিত্র শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসে। (ইমাম আল-গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ১/৩৪৭, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৮২)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সময়ের বাধ্যবাধকতা নিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩)
.আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখা বা ‘প্রোক্রাস্টিনেশন’ হলো মানুষের উৎপাদনশীলতা ও কর্মক্ষমতা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ।
সক্ষম ব্যক্তি যদি কাজ না করে অলস বসে থাকে বা ইচ্ছাকৃতভাবে জীবিকা অর্জনে বিলম্ব করে, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে মাকরুহ ও নিন্দনীয়। (ইমাম বুরহান উদ্দিন আল-মারগিনানি, আল-হেদায়া, ৪/৪১১, আল-বুশরা পাবলিকেশন্স, করাচি, ২০২১)
এই অলসতার মারাত্মক মানসিক ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য নবীজি (সা.) নিয়মিত দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল আজজি ওয়াল কাসালি...’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় চাচ্ছি অক্ষমতা ও অলসতা থেকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৯২)
.মুমিনের জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড আল্লাহর দেওয়া একেকটি মহামূল্যবান পুঁজি। তাই প্রতিটি ক্ষণকে কোনো না কোনো উপকারী জাগতিক বা ধর্মীয় কাজে ব্যয় করা উচিত। (ইবনে রজব হাম্বলি, জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/২৮৮, মুয়ায়সাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০৮)
.ইসলামে ধনসম্পদকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়.কেয়ামতের মাঠে সময়ের হিসাব দেওয়া প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন কোনো বান্দার চরণ দুটি নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—সে তার জীবনটা কোন কাজে অতিবাহিত করেছে এবং তার যৌবনকাল কোন কাজে ক্ষয় করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৬)
.সব কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে কোনো কাজই ঠিকমতো না করতে পারা আধুনিক মানুষের একটি বড় সমস্যা; যা ইসলামি শরিয়তের ‘ফিকহুল আওলাউইয়্যাত’ বা অগ্রাধিকার বিজ্ঞানের পরিপন্থী।
ইমাম শাফেয়ি বলেছেন, একজন বুদ্ধিমান মানুষের উচিত তার কাজের গুরুত্ব অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা—প্রথমে জরুরি ফরজ দায়িত্ব, তারপর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত বা জাগতিক জরুরি কাজ। (ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, ১/৮৯, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৯০)
রাসুল (সা.) মুমিনের জীবনের অগ্রাধিকারের মানদণ্ড নির্ধারণ করে বলেছেন, ‘অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় বর্জন করাই একজন মানুষের ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)
.কঠোর পরিশ্রমের পরও যদি কখনো কাজে বরকত না মেলে, তবে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে চেষ্টার পাশাপাশি বেশি বেশি ‘ইস্তিগফার’ বা ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।
ইমাম গাজালি লিখেছেন, পাপ ও অবাধ্যতা মানুষের উপার্জনের বরকত কেড়ে নেয়, আর ইস্তিগফার মানুষের রিজিক ও কাজের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। (ইমাম আল-গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৪/৪৩, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৮২)
.মহানবী কেন ‘মাদায়েনে সালেহ’ দেখতে নিষেধ করেছেন





