মহাকাশ কেমন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সীমাহীন অন্ধকার, নক্ষত্র আর এক অদ্ভুত শূন্যতা। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় মহাকাশের গন্ধ কেমন? তবে হয়তো অনেকেই চমকে উঠবেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকাশের নিজস্ব একটি ঘ্রাণ রয়েছে, যা অনেকটা পোড়া মাংস, গরম ধাতু, ওয়েল্ডিংয়ের ধোঁয়া এবং মিষ্টি রাসবেরির এক অদ্ভুত মিশ্রণ! আর মহাকাশচারীদের বর্ণনা করা এই অদ্ভুত সুবাসকে এবার পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে বোতলজাত করে সুগন্ধি বা পারফিউমে রূপ দিয়েছেন এক ব্রিটিশ রসায়নবিদ।
মহাকাশ মূলত একটি ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্য স্থান, তাই সেখানে সরাসরি কোনো কিছুর গন্ধ নেওয়া অসম্ভব। কিন্তু স্পেসওয়াক বা মহাকাশে হাঁটা শেষে নভোচারীরা যখন মহাকাশযানের ভেতরে ফিরে আসেন, তখনই ঘটে আসল ঘটনা। এয়ারলকের ভেতরের চাপ যখন স্বাভাবিক হয়, তখন নভোচারীদের স্যুট, গ্লাভস এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতিতে লেগে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক কণা যানের ভেতরের বাতাসের সাথে বিক্রিয়া করে এই সুনির্দিষ্ট গন্ধটি তৈরি করে।
নাসার নভোচারী ডন পেটিট এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, এই গন্ধের বর্ণনা দেওয়া সত্যি কঠিন। এটি এমন কোনো সাধারণ খাবারের মতো নয় যে চট করে বলে দেওয়া যাবে এটির স্বাদ মুরগির মাংসের মতো। আমি সবচেয়ে কাছাকাছি এমন বর্ণনাটি দিতে পারি তা হলো, এটি একটি বেশ চমৎকার মিষ্টি ধাতব অনুভূতি। এটি আমাকে আমার কলেজের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আমি একটি আউটফিটের ভারী যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য আর্ক ওয়েল্ডিং টর্চ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতাম। মহাকাশের গন্ধটি ঠিক সেই ওয়েল্ডিংয়ের মিষ্টি ধোঁয়ার মতো।
ভবিষ্যতের মিশনের জন্য নভোচারীদের প্রস্তুত করতে নাসা এমন একটি সুঘ্রাণ তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়, যা দিয়ে প্রশিক্ষণের সময় নভোচারীদের মহাকাশের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করানো যায়। এই জটিল ও অদ্ভুত চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেন ব্রিটিশ সুগন্ধি রসায়নবিদ স্টিভ পিয়ার্স। নভোচারীদের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, মহাকাশের গন্ধটি মূলত বারুদ, পোড়া স্টেক, রাসবেরি এবং রাম নামের একধরনের অ্যালকোহলের একটি মিশ্রণ। যেহেতু মহাকাশ থেকে সরাসরি কোনো গন্ধের নমুনা বোতলে ভরে পৃথিবীতে আনা সম্ভব নয়, তাই স্টিভ পিয়ার্সকে পুরোপুরি নভোচারীদের ব্যক্তিনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। কয়েক বছরের নিরলস চেষ্টার পর তিনি ধাতব, ধোঁয়াটে, পোড়া এবং হালকা মিষ্টি নোটের সমন্বয়ে একটি ফর্মুলা তৈরি করতে সক্ষম হন, যা মহাকাশের সেই আসল অনুভূতির খুব কাছাকাছি। প্রথমে এটি কেবল নাসার প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও পরে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কারণে মহাকাশের পারফিউম হিসেবে বাণিজ্যিকভাবেও বাজারজাত করা শুরু হয়।
মহাকাশের গন্ধকে রাসবেরি বা বারবিকিউর সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি কেবল কাল্পনিক নয়, এর পেছনে রয়েছে নিখুঁত জ্যোতির্বিজ্ঞান। স্পেনের আইআরএএম ৩০-মিটার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থিত স্যাজিটেরিয়াস বি২ নামক একটি বিশাল আণবিক ধূলিমেঘে ইথাইল ফরমেট নামক যৌগের সন্ধান পেয়েছেন। পৃথিবীতে এই রাসায়নিক যৌগটি রাসবেরির সুগন্ধ এবং ফলের স্বাদের জন্য দায়ী।
পাশাপাশি মহাজাগতিক মেঘে পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন নামক কার্বন-সমৃদ্ধ যৌগের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। এই যৌগ যখন স্পেসক্রাফটের উপাদান এবং উচ্চ শক্তির কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন তা পৃথিবীতে পোড়া খাবার, ধোঁয়া বা চারকোল পোড়ার মতো গন্ধের অনুভূতি জাগায়। মহাকাশের এই গন্ধটি কোনো একক রাসায়নিক উৎস থেকে আসে না। এটি মূলত মহাকাশের তীব্র পরিবেশ, তেজস্ক্রিয় কণা এবং স্পেসস্যুটের উপাদানের মধ্যকার জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল। রসায়নবিদ স্টিভ পিয়ার্সের এই পুনর্নির্মাণটি চিকিৎসা ও মহাকাশ বিজ্ঞানের এমন এক অনন্য উদাহরণ, যা পৃথিবীর বুকে বসেই সাধারণ মানুষকে কোটি মাইল দূরের মহাজাগতিক এক অনুভূতির স্বাদ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া সায়েন্স ডেস্ক






