কোরআন মাজিদ বিভিন্ন জায়গায় পিতৃত্বের প্রসঙ্গটি এনেছে এবং বিভিন্ন ধরনের বাবার উদাহরণ দিয়েছে। তার মধ্য থেকে আমরা কয়েকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই:

১. আদর্শের ভিন্নতা ও সততার মূলনীতি

কোরআনে মূলত নেককার ও আদর্শবান বাবার চিত্রই বেশি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যেমন নুহ, ইব্রাহিম, ইয়াকুব ও লোকমান (আ.)।

তবে এর বিপরীতে একজন অন্যায়কারী বা পথভ্রষ্ট বাবার উদাহরণও দেওয়া হয়েছে, তিনি হলেন ইব্রাহিম (আ.)-এর পিতা আজর। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে পিতৃত্বের মূল ভিত্তিই হলো সততা ও কল্যাণ।

২. তরবিয়তে সক্রিয় অংশগ্রহণ

কোরআনে বর্ণিত প্রতিটি বাবা সন্তানের তরবিয়ত গঠনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। নুহ (আ.)-এর নিজের অবাধ্য সন্তানকে প্লাবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচানোর আকুলতা; ইয়াকুব (আ.)-এর সন্তানদের প্রতিনিয়ত দেওয়া দিকনির্দেশনা এবং লোকমান হাকিমের তাঁর সন্তানকে দেওয়া তাওহিদ ও নৈতিকতার শিক্ষা এর বড় প্রমাণ।

.
আমাদের সমাজে যে ধারণা প্রচলিত আছে—‘সন্তানের দেখভাল করা শুধু মায়ের কাজ আর বাবার কাজ শুধু টাকা আয় করা’—কোরআনের আলোকে এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
.‘পিতা’ শব্দের ব্যবহার কোরআনে যেভাবে হয়েছে.

আমাদের সমাজে যে ধারণা প্রচলিত আছে—‘সন্তানের দেখভাল করা শুধু মায়ের কাজ আর বাবার কাজ শুধু টাকা আয় করা’—কোরআনের আলোকে এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

৩. পিতৃত্ব মানেই ত্যাগ ও সহনশীলতা

কোরআনের পাতা ওলটালে দেখা যায়, পিতৃত্বের অপর নাম যেন সংগ্রাম ও কষ্ট। সন্তানকে সঠিক পথে রাখা বা তাদের আচরণ সয়ে যাওয়ার মধ্যে যে বাবার কত বড় ত্যাগ থাকে, তা নুহ, ইব্রাহিম ও ইয়াকুব (আ.)-এর জীবন দেখলেই বোঝা যায়।

৪. বাবার ত্যাগের বিপরীতে সন্তানের কৃতজ্ঞতা

বাবার এই সীমাহীন ত্যাগের কারণেই আল্লাহ–তাআলা সন্তানের ওপর পিতা-মাতার প্রতি অনুগত থাকাকে ফরজ করেছেন।

.একজন আদর্শ পিতার ৫ গুণ.
যদি আল্লাহ–তাআলা কোরআনে পিতা-মাতার অধিকারের কথা না-ও বলতেন, তবু মানুষের সুস্থ বিবেকই বলে দিত যে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা জরুরি।
ফকিহ আবু লাইস সমরকন্দি (রহ.)
.

আবু লাইস সমরকন্দি লিখেছেন, যদি আল্লাহ–তাআলা কোরআনে পিতা-মাতার অধিকারের কথা না-ও বলতেন, তবু মানুষের সুস্থ বিবেকই বলে দিত যে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা জরুরি। (আবু লাইস সমরকন্দি, তানবিহুল গাফেলিন, পৃষ্ঠা: ১২৪, দারুল হিজরাহ, দামেস্ক, ১৯৯৩)

৫. বেত্রাঘাত নয়, সংলাপ ও যুক্তি

কোরআনে কোনো আদর্শ বাবাকে তাঁর সন্তানের ওপর শারীরিক নির্যাতন বা জোরজুলুম করতে দেখা যায় না।

ইয়াকুব (আ.) যখন জানলেন তাঁর ছেলেরা ইউসুফকে নিয়ে মিথ্যা বলছে, তখনো তিনি রেগে না গিয়ে বললেন, ‘না, বরং তোমাদের মন একটি গল্প বানিয়ে নিয়েছে। সুতরাং সুন্দর ধৈর্যই শ্রেয়।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১৮)

আবার ইব্রাহিম (আ.) যখন সন্তান জবেহ করার স্বপ্ন দেখলেন, তিনি কিন্তু ইসমাইলের ওপর জোর খাটাননি; বরং জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমার মতামত কী?’

অর্থাৎ কোরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে পিতৃত্ব কোনো অন্ধ একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারী ক্ষমতা নয়; তা হলো পারস্পরিক আলোচনা ও ভালোবাসার এক পরম শিক্ষালয়।

.কোরআনের বর্ণনায় পিতৃত্ব