প্রথমে কেউ লক্ষ্য করেনি এই বহিষ্কারের ঘটনা। পাকিস্তানের শহরগ্রামে হঠাৎ ফিরতে শুরু করলেন কিছু শ্রমিক। তাঁদের সঙ্গে কোনো জিনিসপত্র ছিল না, এমনকি পরিবারও জানত না ফিরছেন।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সারা দেশে খবর ছড়িয়ে পড়ে। ফিরে আসা ছেলে-ভাই-বাবাদের মধ্যে অধিকাংশই শিয়া মুসলিম। তাঁরা জীবনের বড় অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কাজ করে কেটেছেন। এরা জানান, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই হঠাৎ ধরে বহিষ্কার করা হয়েছে।

পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের শিয়া নেতারা ‘মিডল ইস্ট আই’কে বলেছেন, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে রহস্যজনকভাবে হাজার হাজার পাকিস্তানি শ্রমিককে বহিষ্কার করা হয়েছে, যাঁদের অধিকাংশই দীর্ঘকাল আরব আমিরাতে কর্মরত ছিলেন।

বহিষ্কৃতদের অনেকের অভিযোগ, আমিরাত কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানায়নি। তবে ভুক্তভোগী ও প্রতিনিধিদের মতে, ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ায় শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি আরব আমিরাতের সন্দেহই এর প্রতিফলন।

আফগান সীমান্তবর্তী খুররাম জেলার ৪৫ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক হুসাইন তুরি বলেন, “তারা আমাদের কোনো কারণ বলেনি। কিন্তু আমরা বুঝেছি। আমাদের একমাত্র অপরাধ, আমরা শিয়া।”

সাম্প্রতিককালে তার গ্রামেই প্রায় ২০০ জন ফিরেছেন আমিরাত থেকে।

এই বহিষ্কার ছিল আকস্মিক ও অস্বচ্ছ। কয়েকজন শ্রমিক বলেন, কারণ ছাড়াই থানায় ডেকে কয়েকদিন আটকে তারপর আইনি সহায়তা বা আপিলের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি পাকিস্তান ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়েছে।

এরা কয়েক দশক ধরে আরব আমিরাতের নির্মাণ, পরিবহন ও সেবা খাতে কাজ করে দেশে অর্থ পাঠাতেন, যার ওপর পরিবার নির্ভরশীল। কাতারেও বছরের শুরুতে একইভাবে কিছু শিয়া শ্রমিক বহিষ্কৃত হন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়াতে বিষয়টি সবার নজরে আসে। তবে পাকিস্তান সরকার উপসাগরীয় দেশগুলো শিয়াদের নিশানা করেছে—এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

৮ মে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ ধরনের খবর বিভ্রান্তিকর এবং কুচক্রী মহলের প্রচারণার অংশ। তারা দাবি করেছে, আরব আমিরাতসহ কোনো দেশেই নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বহিষ্কার হচ্ছে না।

সরকারি অস্বীকার সত্ত্বেও শিয়া নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে কথায় জানা গেছে, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শিয়া কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। আল্লামা আমিন শাহিদী অনুমান করছেন, প্রায় ১৫ হাজার পাকিস্তানিকে বহিষ্কার করা হয়েছে বা আবার ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সঠিক তথ্যের অভাবে এটি যাচাই করা যায়নি।

ভারতের শিয়া সংগঠনগুলোও আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে ভারতীয় শিয়াদের আটক ও আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ঘটলেও ভুক্তভোগীরা বলছেন, বছরের পর বছর নজরদারি চলছে।

নজরদারি ও প্রোফাইলিং

পরিচয় প্রকাশ হলে আমিরাতে রাখা সঞ্চয়, ব্যবসা বা বকেয়া বেতন হারানোর ভয়ে অধিকাংশ বহিষ্কৃত নাম প্রকাশ করতে চাননি।

পাঞ্জাবের চাকওয়াল জেলার কায়সার বলেন, দুবাই মলে সিসিটিভি দিয়ে শনাক্ত করে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, “তারা আমার কাছে এসে সরাসরি আইডি কার্ড চাইল। তারা আগে থেকেই জানত, আমি কে।”

অভিযোগ, ইমামবারগাহে প্রবেশে এমিরেটস আইডি স্ক্যান করতে হয়। এই বায়োমেট্রিক ও যাতায়াতের রেকর্ড দিয়ে শিয়াদের তালিকা তৈরি করে আটক শুরু হয়েছে। সুন্নি মসজিদে এমন কড়াকড়ি নেই।

আব্রাহাম অ্যাকর্ড ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি

২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব আমিরাতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার (আব্রাহাম অ্যাকর্ড) পর থেকে শিয়াদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নজরদারি বেড়েছে। আব্বাস নামের স্থপতি জানান, “ইমামবারগাহে আইডি স্ক্যানের কারণে মানুষ যেতে ভয় পায়।”

এই কড়াকড়িতে সুন্নিরাও পড়ছেন মাঝে মাঝে। সরগোধার রাজিক বলেন, সুন্নি হয়েও ইমামবারগাহে খাবার খেতেন বলে ভুল করে বহিষ্কার করা হয়েছে।

শিয়া-সম্পর্কিত পদবি (জাইদি, আসকারি, জাফরি, হুসাইন, তুর্কি) থাকলে ভিসা বা কাজের অনুমতি দেরি বা বাতিল হচ্ছে। খুররাম বা কোহাটের মতো শিয়াপ্রধান এলাকা থেকে অতিরিক্ত স্ক্রিনিং হচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশে সন্দেহ এবং ‘বিলায়ত-আল-ফকিহ’

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই বহিষ্কার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে আরব আমিরাত ও সৌদি আরব শিয়াদের ইরানের প্রভাব মনে করে।

‘বিলায়ত-আল-ফকিহ’ মতবাদ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর আতঙ্ক রয়েছে। তারা মনে করে, এতে শিয়ারা নিজ দেশের রাজতন্ত্রের চেয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি বেশি অনুগত।

গত ২০ এপ্রিল আরব আমিরাত দাবি করেছে, ইরানপন্থী গোপন সংগঠন ভেঙেছে যারা এই মতাদর্শে বিশ্বাসী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি ঘোলাটে।

হাজার হাজার পাকিস্তানি কর্মী নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন, আয়ের পথ নেই। আমিরাতে ফেলে-আসা সম্পদ ফিরিয়ে আনার আইনি সুযোগও নেই।