যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ গতকাল বৃহস্পতিবার কিউবা সফর করেন। ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই সফরকে অস্বাভাবিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ সময় কমিউনিস্ট শাসিত কিউবা মার্কিন চাপের মুখে তেলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিআইএ। সংস্থাটি জন র‍্যাটক্লিফের সফরের বিষয়টি কিউবা সরকারের তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, র‍্যাটক্লিফসহ কয়েকজন ব্যক্তি কিউবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা প্রধান র‍্যামন রোমেরো কারবেলো এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ছবিতে র‍্যাটক্লিফের সঙ্গীদের মুখ অস্পষ্ট করা হয়েছে।

এই সফর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক আরও সংকটময় হওয়ার মধ্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জ্বালানি অবরোধের কারণে দ্বীপ দেশটিতে নিয়মিত বিদ্যুৎবিভ্রাট চলছে। কিউবার ঐতিহ্যবাহী মিত্র রাশিয়া থেকে মাত্র একটি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছাতে পেরেছে।

জ্বালানিমন্ত্রী ভিসেন্তে দে লা ও লেভি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, সেই তেলের মজুত এখন ‘শেষ হয়ে গেছে’। তিনি বলেন, ‘অবরোধের প্রভাব সত্যিই আমাদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলছে...কারণ, আমরা এখনো জ্বালানি পাচ্ছি না।’

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে সিবিএস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর ৯৪ বছর বয়সী ভাই রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধেও অভিযোগ গঠনের চেষ্টা করছে।

কিউবা এই সফরকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিউবা সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, র‍্যাটক্লিফের সঙ্গে এই বৈঠকটি এমন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে জটিলতা চলছে। উভয় দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপের লক্ষ্য নিয়ে বৈঠকটি করা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই আলোচনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নয় এবং দেশটিকে কথিত সন্ত্রাসে মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকায় রাখারও কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কিউবা জোর দিয়ে বলেছে, তারা ‘কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেনি এবং কিউবার ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালানোরও অনুমতি দেবে না।’ চীনের উপস্থিতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে এ কথা বলা হয়।

ভেনেজুয়েলার তেলসমৃদ্ধ সরকারের শক্তিমান নেতা নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী গত জানুয়ারিতে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার পর কিউবার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভরসাগুলোর একটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি অবরোধ আরোপ করে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আবারও ১০ কোটি ডলারের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, এই সহায়তা কিউবা সরকারের মাধ্যমে নয়, ক্যাথলিক গির্জার মাধ্যমে বিতরণ করতে হবে।

এক্সে এক পোস্টে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেল যুক্তরাষ্ট্রকে অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্যানেল বলেন, ‘অবরোধ তুলে নেওয়া বা শিথিল করার মধ্য দিয়ে এই ক্ষতির মাত্রা আরও সহজ ও দ্রুত উপায়ে কমানো সম্ভব। কারণ, সবাই জানে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে মানবিক সংকটটি তৈরি করা হয়েছে।’

উত্তেজনা থাকলেও দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের আলোচনা চলছে। গত ১০ এপ্রিল হাভানায় উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক হয়েছে। ২০১৬ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা কিউবার রাজধানীতে অবতরণ করেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার আবারও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে পূর্ব কিউবা অন্ধকারে ডুবে যায়। দিনের শেষভাগে কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সচল হয়েছে। এই সংকটে দ্বীপজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। হাভানার উপকণ্ঠে সান মিগেল দেল পাদ্রোনের এক বাসিন্দা এএফপিকে বলেছেন, গত বুধবার সন্ধ্যায় মানুষ হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে প্রতিবাদ করেছে। এএফপির তথ্য অনুসারে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের ছোট বিক্ষোভ হয়েছে। শহরের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্লায়া এলাকায় বাসিন্দারা স্লোগান দিচ্ছিলেন, ‘বাতি জ্বালাও!’

এএফপির তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দীর্ঘ বিদ্যুৎবিভ্রাট ও উৎপাদনে রেকর্ড ঘাটতি দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার কিউবার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা একই সময়ে বিদ্যুৎহীন ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফক্স নিউজকে বলেন, ‘এটি একটি ভেঙে পড়া, অকার্যকর অর্থনীতি এবং এটিকে পরিবর্তন করা অসম্ভব। আমি চাই পরিস্থিতিতে বদল আসুক।’ রুবিও আরও বলেন, ‘এই লোকেরা ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত কিউবার গতিপথ বদলানো সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি না।’