বেইজিংয়ে বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিং এক জমকালো রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেন। এই ভোজের খাদ্যতালিকা কূটনীতির চমৎকার দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। চীনের রাষ্ট্রীয় ভোজে ঐতিহ্যগতভাবে হুয়াইয়াং রন্ধনশৈলীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই শৈলী সাংহাইয়ের আশপাশের অঞ্চল থেকে উদ্ভূত। এর হালকা ও স্নিগ্ধ স্বাদ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। রান্নার কারুকার্য এবং মৌসুমি উপাদান এটিকে বিশেষ করে তোলে।

উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আলোচনা শেষ করতে আয়োজকরা মেনুতে কিছুটা নমনীয়তা আনেন। তালিকায় চীনের জাতীয় খাবার ‘বেইজিং হাঁসের রোস্ট’ রাখা হয়। এছাড়া গরুর পাঁজরের মাংস যুক্ত করা হয়, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সুসিদ্ধ স্টেকের পছন্দের প্রতি সম্মান দেখায়।

মার্কিন অতিথিদের জন্য মিষ্টির তালিকায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিবেশিত হয় তিরামিসু, ফল ও আইসক্রিম। এর সঙ্গে ছিল ‘ট্রাম্পেট-শেল’ বা শঙ্খাকৃতির পেস্ট্রি।

কয়েক দশক ধরে চীন খাবারকে কূটনীতির শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বিদেশি বিশিষ্ট অতিথিদের আপ্যায়নেও এই রীতি অনুসরণ করা হয়। চীনের আধুনিক ইতিহাসে দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে খাবার নিয়ে দীর্ঘ টানাটানি ছিল। সেই অভাবের দিনগুলো খাবারকে চীনা সংস্কৃতিতে আভিজাত্যের প্রতীক করে তোলে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি কর্মকর্তাদের চীন সফরে খাবার নিয়ে চমকপ্রদ ঘটনা ভাইরাল হয়েছে। ২০২৩ সালে বেইজিংয়ের একটি ইউনানি রেস্তোরাঁয় মার্কিন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন ‘ম্যাজিক মাশরুম’ খাওয়া নিয়ে মজার মন্তব্য করেছিলেন। এছাড়া ২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বেইজিংয়ের এক সাধারণ রেস্তোরাঁয় ভাজা কলিজা খেয়ে আলোচনার জন্ম দেন।

চীন বিদেশি অতিথিদের সম্মানে খাবারের নামও রাখে। ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন সফরে তাঁর জন্য বিশেষ মুরগির পদ তৈরি হয়। এসব মেনু পরে স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলো অনুকরণ করে।

সাংহাইয়ের ‘গুই হুয়া লো’ রেস্তোরাঁর নির্বাহী শেফ শি ছিয়াং বলেন, হুয়াইয়াং রান্নার প্রধান শক্তি এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। এর স্বাদ ও ঘ্রাণ বিদেশি অতিথিসহ সবার কাছে প্রিয়। এটি যে কারও রুচির সঙ্গে মানিয়ে যায়।

চীনের আটটি প্রধান আঞ্চলিক রন্ধনশৈলীর একটি হুয়াইয়াং। কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে এর পদগুলো প্রধান আকর্ষণ। তাই এটি অপরিহার্য। ১৯৪৯ সালে চীন প্রতিষ্ঠার ‘ফাউন্ডিং ব্যাংকুয়েট’ে এই খাবার পরিবেশিত হয়। ১৯৯৯ সালে ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ভোজেও ছিল। ২০০২ সালে জিয়াং জেমিন জর্জ ডব্লিউ বুশের সম্মানে আয়োজিত ভোজেও হুয়াইয়াং খাবার ছিল।

এর প্রধান পদগুলোর মধ্যে সিংহমুখী নরম মাংসের মিটবল। ইয়াংঝু ফ্রায়েড রাইস, মিষ্টি-টক সসে তেলে ভাজা ‘স্কুইরেল ফিশ’ জনপ্রিয়। ‘ওয়েনসি তোফু’তে তোফু সুতার মতো কাটা হয়।

ইয়াংসি নদী অববাহিকার উপকরণ এর মূল বৈশিষ্ট্য। শেফরা মিঠাপানির মাছ, ইল মাছ, বাঁশের কোঁড়ল ব্যবহার করেন। অল্প মসলায় উপকরণের স্বাদ ফুটে ওঠে।

সাংহাইভিত্তিক খাদ্য লেখক ক্রিস্টোফার সেন্ট ক্যাভিশ বলেন, ভোজসভার জন্য এই খাবারগুলো দারুণ। উত্তরের শানডং খাবারের চেয়ে হালকা। সিচুয়ানের মতো ঝাল নয়। ক্যান্টনিজ খাবারের তুলনায় সহজলভ্য এবং দুর্লভ উপকরণ কম। তাই সব অতিথির জন্য মানানসই।

ক্রিস্টোফার সেন্ট ক্যাভিশ বলেন, সহজ কথায় এই খাবারগুলো ‘নিরাপদ’। ওয়াশিংটন ডিসির ভোজে মুরগির মাংসের মতো। ঝাল নয়, অদ্ভুতও নয়। ফলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।