বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় ইসরায়েলকে এখন সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। নেতিবাচক দেশের তালিকায় ইসরায়েলের আগে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরান। আর পঞ্চম স্থানে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ হিসেবে দেখা পাঁচ দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র জায়গা করে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেটা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নিরা ডেটা’ প্রকাশিত ২০২৬ সালের গণতন্ত্র ও দেশ–সম্পর্কিত বৈশ্বিক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এদিকে, বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ইতিবাচক মনোভাবের শীর্ষ পাঁচ দেশ হলো সুইজারল্যান্ড, কানাডা, জাপান, সুইডেন ও ইতালি।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ‘গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশনস ২০২৬’ (বৈশ্বিক দেশ–ধারণা সূচক, ২০২৬) তলানিতে ইসরায়েল জায়গা পেয়েছে। বিশ্বের ১২৯টি দেশ ও তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর ৪৬ হাজার ৬৬৭ জন উত্তরদাতার মতামতের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি হয়েছে।
তালিকাটি নিরা ডেটার ‘ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ (গণতন্ত্র ধারণা সূচক, ২০২৬) এর সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ৯৮টি দেশের ৯৪ হাজার ১৪৬ জন নাগরিক তাঁদের দেশের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা কেমন, সে বিষয়ে সরাসরি মতামত দিয়েছেন।
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত হত্যা, ফিলিস্তিনিদের গণবাস্তুচ্যুতি, অনাহার নীতি ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল যে দিন দিন একঘরে হয়ে পড়ছে, এ ফলাফল তারই আরেকটি বড় প্রমাণ।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক আদালতগুলো দখলদার এ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন গুরুতর লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক করার পর থেকেই বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ধসে পড়েছে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রেরও বড় ধস। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে ওয়াশিংটন এখন বিশ্বের সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন হওয়া পাঁচ দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তারা এখন রাশিয়া ও চীনেরও নিচে নেমে গেছে।
জনপ্রিয়তার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন রাশিয়া ও চীনেরও নিচে নেমে গেছে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের নেট রেটিং বা স্কোর ২০২৪ সালের প্লাস ২২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে মাইনাস ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ৩৮ পয়েন্টের একটি বড় পতন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ক্ষোভের কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের এ পতন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, আগ্রাসী শুল্কনীতি, গ্রিনল্যান্ডসংক্রান্ত হুমকি, ইউক্রেনে সহায়তা হ্রাস, ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল দ্বন্দ্বে ওয়াশিংটনের ভূমিকা।
জরিপ অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইসরায়েলের পর যুক্তরাষ্ট্রকে এখন বিশ্বের জন্য একটি বড় বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ গণতন্ত্র মূল্যায়ন সূচকটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক গণতান্ত্রিক জরিপ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি অন্যান্য সূচকের মতো না হয়ে, এটি সরাসরি নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত নেয়। এতে নির্বাচন, বাক্স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, নাগরিক শিক্ষা, ক্ষমতার পৃথক্করণ, আইনের শাসন, সরকারি স্বচ্ছতা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তরসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হয়।
গাজায় নৃশংস হামলা চালানোর পর থেকে বিশ্বজুড়ে জনমত তীব্রভাবে বিপক্ষে চলে যাওয়ার কারণেই মূলত দখলদার ইসরায়েলের এমন নেতিবাচক অবস্থান। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, গাজার অধিকাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে এবং প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও গণহত্যাবিষয়ক গবেষকেরা গাজার এই পরিস্থিতিকে একটি পরিকল্পিত জাতিগত হত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরিপের ফলাফল স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েলকে ক্রমাগত সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ায় ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হচ্ছে। একের পর এক যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসনগুলো জাতিসংঘে ইসরায়েলকে জবাবদিহি করা থেকে রক্ষা করেছে এবং অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
তবে এ জরিপ দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক জনমত এখন মার্কিন শক্তিকে বিচারহীনতা, দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ ও মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করার যুদ্ধের এক প্রতীক হিসেবেই বেশি দেখছে।






