দিনাজপুরের গাবুরা বাজার এখন গ্রীষ্মকালীন টমেটোর সবচেয়ে বড় হাটে পরিণত হয়েছে। এই এক বাজার থেকে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ ট্রাক টমেটো যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। দৈনিক কেনাবেচা হয় ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত এখানে ক্রেতা-বিক্রেতা ও শ্রমিকরা টমেটো বাছাই, বিক্রি, প্যাকিং এবং ট্রাক বোঝাইয়ে ব্যস্ত থাকেন। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সকাল থেকে বিকেল না হওয়া পর্যন্ত সবাই এই কাজে নিযুক্ত।

গাবুরা বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতারা জানান, শীতকালে সারা দেশে টমেটো চাষ হয় যদিও গ্রীষ্মে উত্তরাঞ্চলে এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও যশোর গ্রীষ্মকালীন টমেটোর প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র। এর মধ্যে দিনাজপুর সদরের গাবুরা বাজারে ছোটবড় ৪০০টির বেশি ঘর রয়েছে। আশেপাশে ছোটবড় আরও অনেক আড়ত রয়েছে, যার কিছুতে শতাধিক কর্মী কাজ করেন।

পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা দেশ থেকে তিন শতাধিক পাইকার প্রতিদিন এখানে টমেটো সংগ্রহ করতে আসেন। তাঁদের একজন শফি উদ্দিন, যিনি ৩০ বছর ধরে এ ব্যবসায় যুক্ত। রাজবাড়ী থেকে টমেটো কিনতে এসেছেন তিনি এবং প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ট্রাক সরবরাহ করেন। এসব টমেটো যায় সিলেট, কুমিল্লা, রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামে। শফি উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পঞ্চগড় থেকেও আমি টমেটো সংগ্রহ করি। কিন্তু আশপাশের জেলাগুলোতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর এত বড় বাজার আর নেই।”

গত শুক্রবার সকালে গাবুরা বাজার পরিদর্শনে দেখা গেছে, আড়তে টমেটো বাছাই ও প্যাকিংয়ে কর্মীরা নিযুক্ত। তাদের বড় অংশ শিক্ষার্থী, যারা গ্রীষ্মমৌসুমে দুই মাস বাড়তি আয়ের জন্য কাজ করেন। তারা দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পান। তাদের একজন সামিউল ইসলাম, অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। দিনে ২৫০ ক্রেট প্যাক করে তিনি ৩০০ টাকা আয় করেন। এছাড়া স্থানীয় লোকজনও টমেটো বাছাই ও প্যাকিংয়ে কাজ করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাজার ঘিরে রাস্তার দুপাশের দোকানগুলো টমেটোর কমলা রঙে রঙিন। কেনাবেচায় সহায়তা করতে এজেন্ট শ্রেণিও গড়ে উঠেছে।

* এই বাজার থেকেই দিনে ৬০ থেকে ৭০ ট্রাক টমেটো যায় দেশের বিভিন্ন বাজারে।
* দৈনিক কেনাবেচা হয় ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার টমেটো।
* সারা দেশ থেকে ৩ শতাধিক পাইকার প্রতিদিন এই বাজার থেকে টমেটো সংগ্রহ করেন।
* এক বছরের ব্যবধানে আবাদের জমি বেড়েছে ২৪৩ হেক্টর।

দরদাম ও কৃষকের লাভ

গত শুক্রবার গাবুরা বাজারে মানভেদে প্রতি মণ টমেটো বিক্রি হয়েছে এক হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। চাষিরা জানান, বৃষ্টির কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ায় দাম বেশি পাচ্ছেন তারা এবং লাভও ভালো হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক আরাফাত হোসেন আধা বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করে ১৭০ মণ ফলন পেয়েছেন। খরচ ৩০ হাজার টাকা এবং বিক্রি থেকে দেড় লাখ টাকা আয়। আরাফাত হোসেন মুক্তকণ্ঠকে জানান, এবার গ্রীষ্মকালীন টমেটোর ভালো দাম পেয়েছেন। তাতে লাভও ভালো হয়েছে। একই তথ্য জানান হোসেনপুরের কৃষক আমজাদ হোসেনও।

চাষিদের কাছ থেকে জানা গেছে, সেচ, সার, ড্রেনেজ ও কীটনাশক খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লেগেছে। প্রতি বিঘায় ৩০০ থেকে ৪০০ মণ উৎপাদন হয়েছে। গড়ে প্রতি বিঘায় ৩৫০ মণ এবং প্রতি মণ এক হাজার টাকা দাম ধরলে সাড়ে তিন লাখ টাকা আয়। ভালো লাভে স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

পঞ্চগড়ের দেখাদেখি এ জেলায় গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন পঞ্চগড়ের চেয়ে বেশি আবাদ হয়। তাতে এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর সবচেয়ে বড় হাট হয়ে উঠেছে গাবুরা বাজার।
মো. আফজাল হোসেন, উপপরিচালক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

৩০ টাকা কেজি

কৃষকেরা লাভের কথা বললেও আড়তদাররা পাইকারি ব্যবসায় মন্দা জানাচ্ছেন। পচনশীল পণ্য হওয়ায় সীমিত লাভেই বিক্রি করতে হচ্ছে বলছেন তারা।

১৮ বছর বিদেশে থেকে গাবুরা বাজারে আড়ত খুলেছেন রুবেল মোল্লা। তাঁর আড়তে ৪০ জন কাজ করেন। তিনি জানান, প্রতি মণ গড় দাম এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, তাই লাভ সীমিত।

পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ক্রেটভিত্তিক বিক্রি করেন। প্রতি ক্রেটে ২৬ থেকে ২৭ কেজি টমেটো। প্রতি ক্রেট ঢাকা পর্যন্ত খরচ ২২০ টাকা। গত শুক্রবার প্রতি ক্রেট এক হাজার টাকায় বিক্রি, অর্থাৎ প্রতি কেজি ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা। পরিবহনসহ খরচ মিলিয়ে ৪৫ থেকে ৪৭ টাকা। ঢাকায় বিক্রি হয় ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি।

উৎপাদন বাড়ছে

গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ শুরু হয় ডিসেম্বরে। তিন মাস পর মার্চ থেকে ফলন শুরু এবং এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বাজারে পাওয়া যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে আবাদ বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৬৫ হেক্টর ছিল, এবার ১ হাজার ১০৮ হেক্টর। এক বছরে ২৪৩ হেক্টর বৃদ্ধি।

উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পঞ্চগড়ের দেখাদেখি এ জেলায় গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন পঞ্চগড়ের চেয়ে বেশি আবাদ হয়। তাতে এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর সবচেয়ে বড় হাট হয়ে উঠেছে গাবুরা বাজার।

আফজাল হোসেন আরও বলেন, স্থানীয়ভাবে হিমাগার সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকেরা আরও বেশি দাম পাবেন। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টমেটোর বাজার ধরে রাখা সম্ভব হবে।