লোকসানের কারণে বন্ধ পড়ে থাকা কুষ্টিয়া চিনিকলকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে হস্তান্তর করে আধুনিক শিল্পপার্ক গড়ার পরিকল্পনা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বেজার পরিচালনা পর্ষদও এটি নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে এখনো কোনো গতি দেখা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিনিকলের বিপুল ঋণের দায় কে নেবে, জমি ও অবকাঠামোর মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এবং শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব জটিলতার কারণে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আটকে আছে।
গত ২৬ জানুয়ারি বেজার পরিচালনা পর্ষদের নবম সভায় কুষ্টিয়া চিনিকলকে এই সংস্থার অধীনে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়। একই সভায় চিনিকলের জায়গাটিকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। ওই সভায় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ শিল্প উপদেষ্টা এবং শিল্পসচিব উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রায় ২০০ একরের বেশি জায়গাজুড়ে থাকা চিনিকলটিতে ইতিমধ্যে পানি, বিদ্যুৎ, সড়ক ও অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের অনেক প্রাথমিক সমস্যা আগে থেকেই সমাধান করা আছে। তাই জায়গাটি সহজেই শিল্পকারখানা নির্মাণে ব্যবহার করা যাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নানা জটিলতায় কুষ্টিয়া চিনিকল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এখন অনেকটাই থমকে আছে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীনে মোট ১৫টি চিনিকল রয়েছে। বর্তমানে চালু আছে নয়টি। চালু থাকা চিনিকলগুলোর মধ্যে শুধু চুয়াডাঙ্গার কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লাভ করছে, বাকি আটটিই লোকসানে। অন্য ছয়টি চিনিকলে পাঁচ বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ।
জানা গেছে, ১৯৬১ সালে কুষ্টিয়া চিনিকলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে ১৯৬৬-৬৭ মাড়াই মৌসুম থেকে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সরকার চিনিকলটিকে রাষ্ট্রীয়করণ করে।
* কুষ্টিয়া চিনিকলের মোট সম্পদমূল্য ২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা।
* ২০০১ সালের পর চিনিকলটি আর লাভের মুখ দেখেনি।
* সেখানে কৃষিপ্রক্রিয়াজাত, পোশাক ও রাসায়নিক শিল্প গড়তে চায় বেজা।
কুষ্টিয়া শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে জগতি এলাকায় ২১৬ একর জমিজুড়ে গড়ে তোলা হয় এই চিনিকল। এর মধ্যে ২২ একর জায়গায় করা হয় কারখানা। সেখানে একতলা প্রশাসনিক ভবন, বিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। চিনিকলটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে এর মোট সম্পদমূল্য দেখানো হয়েছে ২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এর প্রায় পুরোটাই জমির মূল্য।
বিএসএফআইসি সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া চিনিকল প্রতিষ্ঠার পর তিন দশকের বেশি সময় লাভজনক ছিল। ২০০১ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে পড়ে। এরপর আর লাভে ফিরতে পারেনি। প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার বেশি লোকসানের মুখে পড়ে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৩৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
কুষ্টিয়া চিনিকলের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকারি ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রতিষ্ঠানটির নেওয়া ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া কৃষিঋণ বা ক্যাশ ক্রেডিটের পরিমাণ ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরে ছিল ২৭৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি ঋণের কিস্তি বা সুদ পরিশোধ করছে না। ফলে পুঞ্জীভূত দেনা বাড়ছে। এসব দায়দেনার বিস্তারিত নথিপত্রও প্রতিষ্ঠানটির কাছে নেই।
কুষ্টিয়ার চিনিকলের বিষয়ে আমাদের আর কোনো বক্তব্য নেই। এ বিষয়ে যখন সিদ্ধান্ত হয় তখন আমাদের কাছে কোনো মতামত চায়নি। আর কারখানা যেহেতু বন্ধ এবং লোকসান বাড়ছে সেহেতু আমরা এ বিষয়ে আর আপত্তি করিনি।
মো. ওবায়দুর রহমান, শিল্পসচিব
বেজার কর্মকর্তারা মুক্তকণ্ঠকে জানান, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর কুষ্টিয়া চিনিকলকে বেজার অধীনে এনে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করার কাজ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু এ জন্য আগে বেজার নামে নামজারি ও মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। তবে জমির মূল্য ও ঋণের দায় নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হওয়ায় কাজ এগোচ্ছে না।
বিএসএফআইসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, চিনিকল হস্তান্তরের জন্য বেজা থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সেখানে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জানতে চাইলে শিল্পসচিব মো. ওবায়দুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কুষ্টিয়ার চিনিকলের বিষয়ে আমাদের আর কোনো বক্তব্য নেই। এ বিষয়ে যখন সিদ্ধান্ত হয় তখন আমাদের কাছে কোনো মতামত চায়নি। আর কারখানা যেহেতু বন্ধ এবং লোকসান বাড়ছে, সেহেতু আমরা এ বিষয়ে আর আপত্তি করিনি।’
শিল্পসচিব জানান, চিনিকলটির বিশাল জমি রয়েছে। উপযুক্ত দাম পেলে তাঁদের আপত্তি থাকবে না। তবে কারখানার ঋণ আগে নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তার বিষয়টিও দেখতে হবে।
এদিকে বেজার নির্বাহী সদস্য মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা হলে সেখানে আর চিনিকল থাকবে না। কৃষিপ্রক্রিয়াজাত, তৈরি পোশাক ও রাসায়নিকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে। এতে দক্ষিণবঙ্গে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি হবে।
মো. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, সেখানে ইতিমধ্যে পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে, কাছাকাছি এলাকায় গ্যাসও আছে। তাই বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করে যেসব শিল্প গড়ে তোলা যায়, সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া ঋণ ও শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।






