মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগ তুলে ধরা একটি প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ করেছে আদালত। এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে দুই সাংবাদিককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাওয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘আদাদু’তে কর্মরত সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহজাহানকে ১৫ দিন এবং লিভান আলী নাসিরকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছে রাজধানী মালের এক ফৌজদারি আদালত গত মঙ্গলবার। গত বুধবার ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে) এই ঘটনার ‘তীব্র নিন্দা’ জানায়। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এই সাজাকে ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার একটি শাস্তিমূলক প্রচেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছে।

ঘটনার মূলে রয়েছে ‘আয়শা’ শিরোনামের প্রামাণ্যচিত্র। গত ২৮ মার্চ ‘আদাদু’র সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে এটি প্রকাশিত হয়। এতে পরিচয় গোপন রাখা এক নারী দাবি করেছেন, ৪৭ বছর বয়সী মুইজ্জুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জনক। তিনি অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

আদাদুতে পুলিশের অভিযান

প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশের পর গত এপ্রিলে পুলিশ ‘আদাদু’র কার্যালয়ে অভিযান চালায়। এতে সাংবাদিক, বিপণনকর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ল্যাপটপসহ হার্ডড্রাইভ ও পেনড্রাইভ জব্দ হয়। ‘আদাদু’র তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু তাঁর সাবেক নারী সহকারীকে গভীর রাতে ফোন করতেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলায় শাহজাহানকে জেল দেওয়া হয়। প্রসিকিউটরদের অনুরোধে সোমবার আদালত প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে আলোচনার নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে খবর প্রকাশ করায় নাসির সাজা পান।

আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আদেশে বলা হয়, সম্মানের অধিকার রক্ষায় সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী এসব অভিযোগ নিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো আলোচনাই করা যাবে না। ‘আদাদু’ জানায়, বিচার গোপনে হয়েছে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ। আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার জন্য মাত্র দুই ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ পাননি সাংবাদিকরা। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ‘আমাদের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই প্রথম দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর মুখপাত্র মোহাম্মদ হোসেন শরিফ সমালোচনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই ফৌজদারি বিচারিক প্রক্রিয়াকে গণমাধ্যমের ওপর হামলা হিসেবে দেখানোর যেকোনো চেষ্টা অযৌক্তিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ তিনি আরও বলেন, এই মামলাগুলোর সঙ্গে ‘স্বাধীন সাংবাদিকতার আইনি অধিকার ও দায়িত্বের কোনো সম্পর্ক নেই’। শরিফ দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু গণমাধ্যমকে কাজ করার অভূতপূর্ব সুযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর সরকারি নীতি পর্যালোচনার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে একটি দায়িত্বশীল, প্রাণবন্ত ও মুক্ত গণমাধ্যম আমাদের গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।’

বিচারের মুখোমুখি সম্পাদকেরা

‘আদাদু’র দুই সম্পাদক হোসেন ফিয়াজ মুসা ও হাসান মোহাম্মদ এখন বিচারের মুখোমুখি। তাঁদের বিরুদ্ধে ইসলামি আইন অনুযায়ী ‘কজফ’ বা ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনার মামলা হয়েছে। এই অপরাধে দোষী হলে এক বছর সাত মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৮০টি দোররা মারার বিধান রয়েছে। গত বুধবার মালের রুদ্ধদ্বার কক্ষে তাঁদের বিচার শুরু হয়। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সাবেক কর্মী আয়শাত এশা আশরাফকেও প্রামাণ্যচিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তদন্ত করছে পুলিশ।

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) ‘আদাদু’র ওপর পদক্ষেপকে ‘বিচার বিভাগীয় হয়রানি’ বলে বর্ণনা করেছে এবং কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে। মালদ্বীপ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এই সাজাকে ‘মালদ্বীপের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নজিরবিহীন’ বলেছে। তাদের যুক্তি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা সাংবিধানিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। সংগঠনটি বলেছে, গণমাধ্যমের ওপর এ ধরনের পদক্ষেপ মুইজ্জু সরকারের আমলে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত’।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ এই সাজার সমালোচনা করেছেন। তাঁর দল মালদ্বীপ ডেমোক্রেটিক পার্টি (এমডিপি) ‘আদাদু’র সমর্থন করেছে। সলিহ বলেন, এটি গণমাধ্যমকে ভয় দেখানো এবং জনমত স্তব্ধ করার সরকারি অপচেষ্টার ‘আরেকটি লজ্জাজনক অধ্যায়’। সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি হুসনু আল সুউদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্টে লিখেছেন, এই পদক্ষেপ ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার নীতিকে ক্ষুণ্ণ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়।’

বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রের দেশ মালদ্বীপে এই ঘটনা গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে নতুন গণমাধ্যম আইন পাস হয়, যা সরকার-সমর্থিত কমিশনকে সংবাদমাধ্যম বন্ধ বা জরিমানা করার ক্ষমতা দিয়েছে। গত বছর মুইজ্জুর সহযোগীরা সুপ্রিম কোর্টে পরিবর্তন আনেন, তিন বিচারককে অপসারণ করা হয়। সাবেক বিচারকেরা এটাকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেছেন। সরকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ‘আয়শা’ প্রকাশের পর সাংবিধানিক গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সরকারি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।