যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করলে তেহরান আশপাশের আরব দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে। এর মধ্যে সৌদি আরবও হামলার শিকার হয়। জবাবে সৌদি আরব গোপনে ইরান ভূখণ্ডে একাধিক হামলা চালায়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তা ও ইরানের দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে। তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার রয়টার্স এ বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

রয়টার্সের মতে, ইরানের ভূখণ্ডে সৌদি আরবের এমন সরাসরি সামরিক অভিযানের খবর আগে কখনো জানা যায়নি। এটি স্পষ্ট যে, প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় সৌদি আরব অনেক বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে।

ওই দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, গত মার্চের শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি বিমানবাহিনী অভিযান চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের একজন বলেন, “সৌদি আরব আক্রান্ত হওয়ার পরই পাল্টা জবাব দিতে হামলার পথ বেছে নেয়।”

সৌদি হামলার লক্ষ্যবস্তু কী ছিল, তা নিশ্চিত হয়নি রয়টার্সের কাছে। সৌদি সরকারও এসব হামলা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।

ইরানে পাল্টা সামরিক অভিযান চালিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত—গত সোমবার এ খবর প্রকাশ করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। এর পরপরই সৌদি আরবের ‘গোপনে’ হামলার খবর জানাল রয়টার্স। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির সময়ে ইরানের হামলায় বিপর্যস্ত উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো যে পাল্টা আঘাত হেনেছে, সে খবর এত দিন অনেকটা আড়ালে ছিল।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরাসরি কিছু বলেননি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

সৌদি আরবের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। আত্মরক্ষায় দেশটি মার্কিন বাহিনীর ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ১০ সপ্তাহ ধরে চলা ইরান যুদ্ধ মার্কিন সুরক্ষাবলয় ভেদ করে সৌদি ভূখণ্ডে ইরানের হামলা ঘটায়।

প্রতিবেশীদের পাল্টা আঘাত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে। ইরান দ্রুত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) ছয়টি দেশে হামলা চালায়, যার মধ্যে সৌদি আরবও ছিল। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে।

ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছাড়াও বেসামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, তেল শোধনাগারে হামলা করে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ববাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়। ইরানের তেলসমৃদ্ধ প্রতিবেশীরাও ক্ষতির মুখে পড়ে।

ইরানের ভূখণ্ডে সৌদি আরবের প্রতিশোধমূলক হামলা এবং এরপর উত্তেজনা কমিয়ে আনার পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ বাস্তবে উপলব্ধি করেছে যে নিয়ন্ত্রণহীন উত্তেজনা বৃদ্ধি অগ্রহণযোগ্য মূল্য ডেকে আনতে পারে।
আলী ভায়েজ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান-বিষয়ক প্রকল্প পরিচালক

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত সোমবার জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানে পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। এরপর রয়টার্স সৌদির গোপন হামলার খবর প্রকাশ করে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় ইরানের হামলায় বিপর্যস্ত উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর পাল্টা আঘাতের খবর আগে আড়ালে ছিল।

যুদ্ধকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত কড়া অবস্থান নেয় এবং ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ক্ষতিপূরণ চায়। তেহরানের সঙ্গে প্রকাশ্য কূটনীতি কম রাখে।

সৌদি আরব সংঘাত বাড়তে না দিয়ে রিয়াদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে। রাষ্ট্রদূতের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সাড়া পাওয়া যায়নি। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “উত্তেজনা প্রশমন, সংযম প্রদর্শন ও উত্তেজনা কমানোর পক্ষে আমরা আমাদের আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছি, যাতে এ অঞ্চল ও সৌদি আরবের জনগণের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।”

হামলা ও উত্তেজনা প্রশমন

সংশ্লিষ্ট ইরানি ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরব ইরানকে হামলার কথা জানায় এবং আরও হামলা হলে কড়া পাল্টা জবাবের হুমকি দেয়। এরপর দুই দেশ নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ করে উত্তেজনা কমিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় পৌঁছায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান-বিষয়ক প্রকল্প পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ইরানের ভূখণ্ডে সৌদি আরবের প্রতিশোধমূলক হামলা এবং এরপর উত্তেজনা কমিয়ে আনার পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ বাস্তবে উপলব্ধি করেছে যে নিয়ন্ত্রণহীন উত্তেজনা বৃদ্ধি অগ্রহণযোগ্য মূল্য ডেকে আনতে পারে।

ওয়াশিংটন ও তেহরান গত ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। যুদ্ধবিরতির আগে সৌদি-ইরান উত্তেজনা প্রশমনের অনানুষ্ঠানিক চেষ্টা সফল হয়। হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে রয়টার্স জবাব পায়নি।

ইরানের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, তেহরান ও রিয়াদ উত্তেজনা কমাতে রাজি হয়েছে। লক্ষ্য ‘শত্রুতা বন্ধ করা, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি ঠেকানো’।

ইরানি ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইরানকে এসব হামলার কথা জানানো হয়েছে। আরও হামলা হলে কড়া পাল্টা জবাবের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এরপর দেশ দুটি নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করে। উত্তেজনা কমিয়ে আনতে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় পৌঁছায়।

মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ও সৌদি আরব নানা সংঘাতে পরস্পরবিরোধী গোষ্ঠী সমর্থন করে আসছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সমঝোতা হয়ে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে একমত হয়।

হরমুজ প্রণালী বন্ধে উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি রপ্তানিতে সংকটে পড়ে। তবে লোহিত সাগর দিয়ে নৌচলাচল উন্মুক্ত থাকায় সৌদি আরব জ্বালানি রপ্তানি চালিয়ে অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক সুরক্ষিত থাকে।

হামলা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা

গত ১৯ মার্চ রিয়াদে সংবাদ সম্মেলনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বলেছিলেন, “প্রয়োজন মনে করলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সৌদি আরবের রয়েছে।”

তিন দিন পর সৌদি আরব রিয়াদে নিযুক্ত ইরানের সামরিক অ্যাটাশে ও দূতাবাসের চারজন কর্মকর্তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, মার্চের শেষের দিকে সৌদি-ইরান উত্তেজনা ফিকে হয়। পারস্পরিক কূটনীতি ও কড়া পাল্টা জবাবের হুমকির ফলে বোঝাপড়া হয়।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে রয়টার্স দেখেছে, ২৫ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে ১০৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এপ্রিলের ১ থেকে ৬ তারিখে সংখ্যা নেমে ২৫-এর কিছু বেশিতে।

ইরাক থেকেও সৌদি আরবে বেশ কিছু হামলা হয়। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, গত ৭ ও ৮ এপ্রিল ৩১টি ড্রোন ও ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।

এরপর ইরান-ইরাকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ ভাবে সৌদি আরব। তবে পাকিস্তান যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে আশ্বস্ত করে এবং কূটনৈতিক সংযমের আহ্বান জানায়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির পর উত্তেজনা ফিকে হয়।