কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ফলে বিভিন্ন খাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ছে এবং চাকরির ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি চাকরি হারানোর ভয়ও বাড়ছে। তবে এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নেতৃত্ব, আবেগ বোঝার ক্ষমতা, কর্মী পরিচালনা বা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার মতো দক্ষতা আগামী এক দশকে সহজে এআইয়ের কবলে পড়বে না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান গোহিউম্যানাইজের এ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী ১০ বছরে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ চাকরি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির আওতায় চলে যেতে পারে। বর্তমানে এআই কোড লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, আধেয় (কনটেন্ট) তৈরি বা বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ করতে সক্ষম হলেও মানবিক উপলব্ধি, বিচারবোধ, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্পর্কনির্ভর দক্ষতায় এখনো মানুষের সমতুল্য হয়নি। গবেষণায় নিয়োগদাতাদের কাছ থেকে দক্ষতার গুরুত্ব, চাকরির বিজ্ঞাপনে চাহিদা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রতিস্থাপন সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ফলাফলে দেখা গেছে, নেতৃত্ব, আবেগ বোঝা এবং জটিল সামাজিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সঙ্গে জড়িত দক্ষতাগুলো ভবিষ্যতে সবচেয়ে নিরাপদ। অন্যদিকে, তথ্য বিশ্লেষণের মতো বর্তমানে চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতাগুলো এআই তুলনামূলক সহজে স্বয়ংক্রিয় করতে পারবে। সবচেয়ে নিরাপদ তালিকায় শীর্ষে নেতৃত্ব। গবেষকদের মতে, নেতৃত্ব-সম্পর্কিত প্রায় ৩১ শতাংশ কাজ প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভব হলেও এর মূল মানবিক দিকগুলো যন্ত্রের নাগালের বাইরে। তাই নেতৃত্বের মানবনির্ভরতার স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৯৩। কারণ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, সামরিক কর্মকর্তা বা জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক পদে মানবিক সম্পর্ক, পরিস্থিতি অনুধাবন এবং বিশ্বাস তৈরির সক্ষমতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় স্থানে সহযোগিতা ও দলগত কাজের দক্ষতা। বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ চাকরির বিজ্ঞাপনে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, কার্যকর দলগত কাজ শুধু দায়িত্ব ভাগাভাগিতে সীমাবদ্ধ নয়, এতে সহকর্মীদের মানসিক অবস্থা বোঝা, ভিন্ন যোগাযোগ মানিয়ে নেওয়া, ব্যক্তিত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস গড়া জড়িত। এই জটিলতার কারণে এর মানবনির্ভরতার স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৭৯।

তৃতীয় স্থানে আলোচনার দক্ষতা। বর্তমানে প্রায় ২৮ লাখ চাকরির বিজ্ঞাপনে এটি চাওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ বা বিশ্লেষণে এআই সাহায্য করলেও আলোচনার বড় অংশ মানুষের ওপর নির্ভরশীল। গবেষকদের মতে, সফল আলোচনায় শরীরী ভাষা বোঝা, কণ্ঠস্বর অনুধাবন, আস্থা তৈরি ও আবেগীয় পরিবর্তনে সাড়া দেওয়া দরকার। তাই এর স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৮৯।

গবেষণায় কোচিং ও মেন্টরিং দক্ষতাকেও নিরাপদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নেতৃত্ব, শিক্ষা, খেলাধুলা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এর গুরুত্ব বেশি। গবেষকদের মতে, কারও পিছিয়ে পড়ার কারণ বোঝাতে তথ্য বিশ্লেষণ নয়, মানবিক উপলব্ধি প্রয়োজন। জ্ঞানের ঘাটতি নাকি আত্মবিশ্বাসের অভাব—এসব সূক্ষ্ম বিষয় এআইয়ের পক্ষে কঠিন।

মানুষের সামনে কথা বলার দক্ষতা শীর্ষ পাঁচে। গবেষণায় বলা হয়েছে, আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে এই ক্ষমতা যন্ত্র পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না। বর্তমানে প্রায় ২৫ লাখ চাকরির বিজ্ঞাপনে যোগাযোগ বা কথা বলার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।

শীর্ষ ১০-এ অন্য দক্ষতা: সাংগঠনিক নেতৃত্ব, পিপল ম্যানেজমেন্ট, আবেগসংক্রান্ত বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারপারসোনাল স্কিল ও চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট।

গবেষণার ফলাফল নিয়ে গোহিউম্যানাইজের প্রতিষ্ঠাতা জানান, দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত নিরাপত্তায় শিক্ষাব্যবস্থা ভুল জায়গায় জোর দিচ্ছে। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা দ্রুত স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস