রাজশাহীতে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে এক ট্রাক জিরা লুটের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার রাতে মামলা দায়ের হয়েছে। ব্যবসায়ী মো. ফেরদৌস সরদার (২৬) এই মামলায় বাদী হয়েছেন।

আগের ৬ মে বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌর এলাকায় ডেকে নিয়ে পাবনার পাইকারি ব্যবসায়ী ফেরদৌসের ৩০০ বস্তা জিরা লুট করা হয়। ঘটনার পর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বাঘা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন, কিন্তু মীমাংসার কথা বলে মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়। অবশেষে মঙ্গলবার রাতে তিনি বাঘা থানায় মামলা দায়ের করেন। গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, মামলা হয়েছে।

ব্যবসায়ী ফেরদৌস পাবনার সুজানগর থানার চর চিনাখড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, মামলার প্রধান আসামি বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সুজাত আহম্মেদ (৫৫)। অন্য আসামিরা হলেন তাঁর ভাই মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (৪৫), ভাগনে মো. সুইট (২৫) ও মো. শান্ত (২৮)। সুজাত আহম্মেদের বাড়ি আড়ানী পৌর এলাকার জোতরঘু মহল্লায়। তাঁর দুই ভাগনের বাড়ি আড়ানী পৌরসভার পালপাড়া এলাকায়।

ফেরদৌস সরদার একজন ইমপোর্ট (আমদানি) ব্যবসায়ী। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা মালামাল কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি বিক্রি করেন। এই সূত্রে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সিনারুল ইসলাম (৩৩) নামের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। আসামি সুইট ও শান্ত সিনারুল ইসলামের মাধ্যমে ৩০০ বস্তা (৯ হাজার কেজি) জিরা কেনার জন্য কথা পাকা হয়। ৬ মে ভোর চারটার দিকে পাবনা থেকে একটি ট্রাকে জিরা দিয়ে আড়ানীতে পাঠানো হয়। এতে প্রতি বস্তায় ৩০ কেজি করে মোট ৯ হাজার কেজি জিরা ছিল। ৫৫০ টাকা কেজি হিসেবে জিরার দাম হয় ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ট্রাকটি রাজশাহীর পুঠিয়ায় এলে মধ্যস্থতাকারী ব্যবসায়ী সিনারুল ইসলাম ট্রাকে ওঠেন। সকাল আটটার দিকে ট্রাক আড়ানীতে পৌঁছায়। তাঁরা ১৫০ বস্তা জিরা একটি ভটভটিতে ও বাকি জিরা সুজাত আহম্মেদের গুদামে আনলোড করতে চান। সিনারুল ইসলাম মালপত্র নামানোর আগে টাকা চাইলে তাঁরা পূবালী ব্যাংকের সই করা একটি ফাঁকা চেক দেন। তারপর ১৫০ বস্তা জিরা ভটভটিতে ও বাকি ১৫০ বস্তা সুজাত আহম্মেদের বাসাসংলগ্ন গুদামে নামিয়ে রাখা হয়। ১৫০ বস্তা জিরা নিয়ে ভটভটিটি নাটোরের লালপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। এরপর সিনারুল টাকা চাইলে তাঁরা তাঁকে একটি বাজার করা প্লাস্টিকের ব্যাগে ২৫ লাখ টাকা দেখান; কিন্তু তাঁকে সেই টাকা দেওয়া হয়নি। বাকি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংক খুললে চেক জমা দিলেই পাওয়া যাবে বলে আশ্বাস দেন।

সিনারুল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রমাণ রাখার জন্য তিনি ট্রাকচালকের সহকারীকে গুদামের জিরার বস্তার একটি ভিডিও করতে পাঠান। সহকারী গিয়ে দেখেন, মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই সেখান থেকে সব জিরা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ব্যাংক খুললে গোপনে তিনি গিয়ে দেখেন, চেকের বিপরীতে ব্যাংকে কোনো টাকা নেই। এরপর তাঁদের কাছে টাকা চাইলে তাঁরা কালক্ষেপণ করতে থাকেন। ওই দিন বেলা তিনটার দিকে আড়ানী বাজার থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে একটি চায়ের দোকানের পেছনে নিয়ে গিয়ে চাকু ধরে সিনারুল ইসলামকে দেওয়া ব্যাংকের চেকটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার ভোর পাঁচটার দিকে এ বিষয়ে জিরার মূল মালিক ফেরদৌস সরদার বাঘা থানায় একটি অভিযোগ করেন। সারা দিন এ নিয়ে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে জিরা উদ্ধার করতে পারেনি।

পরে আড়ানী পৌর বিএনপির সভাপতি তোজাম্মেল হক দায়িত্ব নিয়ে রাত ১০টার দিকে ১১০ বস্তা জিরা উদ্ধার করে দেন। বাকি জিরার দাম দুদিন পরে গত রোববার পরিশোধ করা হবে বলে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি মীমাংসা করে দেন। ভুক্তভোগীরা রোববার সারা দিন আড়ানীতে গিয়ে বসে থাকেন; কিন্তু তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তোজাম্মেল হক আরও দুই জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে ৬৫ বস্তা জিরা উদ্ধার করে দেন। বাকি জিরা বা টাকার আর কোনো খোঁজ নেই।

বিএনপি নেতা তোজাম্মেল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করে ১৭৫ বস্তা জিরা উদ্ধার করেছেন। এরপর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীকে আইনের আশ্রয় নিতে বলেছেন। এর মধ্যে গত শুক্রবার সুজাতকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়। তিনি তখন বলেছিলেন, "তাঁর ভাগনেরা জিরা কিনেছিল। সেটি মীমাংসা হয়ে গেছে।" এরপর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।