থাইল্যান্ডের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা আজ সোমবার আট মাস কারাদণ্ড ভোগের পর প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর এক বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। মানুষের ভালোবাসা ও ঘৃণা উভয়ই তাঁর জীবনে সমানভাবে রয়েছে।
শতকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী হয়ে জনমুখী নীতিগুলোর মাধ্যমে থাকসিন থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছিলেন। এসব নীতির ফলে গ্রামীণ এলাকায় তাঁর দল শক্তিশালী হয়। কিন্তু এই সাফল্যের জন্য তাঁকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। ক্ষমতাবান শ্রেণি ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর চোখে তিনি ছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত, কর্তৃত্ববাদী এবং অস্থিরতার সৃষ্টিকর্তা। ফলে তাঁর পরিবারকে তারা তীব্রভাবে অপছন্দ করত।
গত দুই দশকে অভ্যুত্থান থেকে ক্ষমতাচ্যুতি, একাধিক মামলায় দণ্ডিত হওয়া—এসব সংকটের মধ্য দিয়ে থাকসিন যাতায়াত করেছেন। এগুলো তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব শেষ করে দিতে পারত। তবু বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এখনো ফিউ থাই পার্টির মূল নিয়ন্ত্রক। চলতি বছরের নির্বাচনে দলটি রেকর্ডসংখ্যক আসন হারালেও নতুন ক্ষমতাসীন জোটে যোগ দিতে পেরেছে। তাঁর ভাগনে মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন।
২০০১ ও ২০০৫ সালে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন থাকসিন সিনাওয়াত্রা। ২০০৬ সালে সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর দুই বছর পর তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। ২০২৩ সালে দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হন তিনি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি বিশেষজ্ঞ পল চেম্বার্স বলছেন, মুক্তি পাওয়ার পর থাকসিন ফিউ থাই পার্টির কার্যক্রমে আরও সরাসরি ভূমিকা নেবেন। তবে তাঁর ৭৬ বছর বয়স সংশয় সৃষ্টি করেছে। তিনি আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে ফিরতে পারবেন না, বরং পরিবারের তরুণ প্রজন্মের হাতে দলের জনসমক্ষের নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে পারেন।
থাকসিন গড়ে তুলেছিলেন থাই রাক থাই পার্টি। এটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর ফিউ থাই পার্টি নামে দলটি পুনরুজ্জীবিত হয়। থাকসিনের পর তাঁর বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা ও মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন তাঁর এক ভাগনে।
২০২৩ সালের আগস্টে ফিউ থাই পার্টির ক্ষমতায় ফেরার দিনে থাকসিন দেশে ফিরে ব্যাংককে পৌঁছান। সমর্থকরা তাঁকে বীরের মতো স্বাগত জানায়। পরপরই গ্রেপ্তার ও আট বছরের কারাদণ্ড হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক দিন পর রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন সাজা এক বছরে নামিয়ে দেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্যাংকোকের নিজ বাড়িতে ফিরে যান।
গত সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, থাকসিন যথাযথভাবে সাজা ভোগ করেননি। আদালত তাঁকে আবার এক বছরের জন্য কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
থাকসিনের জন্ম ১৯৪৯ সালে উত্তর থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই প্রদেশের এক চীনা অভিবাসী প্রভাবশালী পরিবারে। প্রথমে পুলিশ কর্মকর্তা, পরে ডেটা নেটওয়ার্কিং ও মোবাইল কোম্পানি গড়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করেন। এগুলো শিন করপোরেশনে রূপান্তরিত হয়। ১৯৯৮ সালে রাজনীতিতে নামেন, থাই রাক থাই পার্টি গড়েন। ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হন।
বয়স্ক থাকসিন শক্তিতেও এখন অনেক দুর্বল। তিনি হয়তো এখন ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর জন্য কিছুটা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গণ্য হতে পারে, কিন্তু আগের মতো বড় চ্যালেঞ্জ আর নন।—পল চেম্বার্স, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি বিশেষজ্ঞ
আর্থিক সংকটের সময় গ্রামীণ দরিদ্রদের দারিদ্র্যমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ আন্তর্জাতিক সমালোচনা ডাকে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এতে প্রায় ২ হাজার ৮০০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। তবু ২০০৫ সালে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন।
দুর্নীতি অভিযোগ, বিশেষ করে শিন করপোরেশনের শেয়ার বিক্রিতে করছাড় নিয়ে বিতর্কে চাপে পড়েন। ২০০৬ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে। তিনি তখন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনে ছিলেন। থাই রাক থাই নিষিদ্ধ হলে ফিউ থাই পার্টিতে রূপ নেয়। ২০১১ সালে বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী হন, ২০১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন।
২০২৩ নির্বাচনে ফিউ থাই দ্বিতীয় হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে তৃতীয়। ফিউ থাই জোট গঠনে থাকসিন ফিরে আসেন। তাঁর মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হন, পরে পদচ্যুত হন। এরপর অনুতিন চার্নভিরাকুল প্রধানমন্ত্রী হন। অনেকে মনে করেন, থাকসিনের মুক্তির পিছনে রাজনৈতিক সমঝোতা।
পল চেম্বার্স বলছেন, থাকসিন এখন ক্ষমতাশালীদের ‘প্রধান শত্রু’ পদ থেকে সরে এসেছেন। প্রগতিশীল পিপলস পার্টির কাছে সেটা চলে গেছে।






