দশম হিজরিতে নবীজি (সা.) ঘোষণা দেন, তিনি এ বছর হজ পালন করবেন। এ খবর পেয়ে লোকজন বাহন নিয়ে বা পায়ে হেঁটে মদিনার উদ্দেশে রওনা দেন।

মদিনায় তখন বিপুল জনতার সমাবেশ হয়। সকলেরই একই আকাঙ্ক্ষা—হজযাত্রায় নবীজির সঙ্গী হয়ে তাঁর সান্নিধ্যের সৌরভ লাভ করা।

২৪ জিলকদ, শুক্রবার। নবীজি (সা.) জুমার খুতবা আলোচনা করছেন। তাঁর চারপাশে জড়ো হয়েছে হজ পালনের উদ্দেশ্যে আগত সেই জনতা। প্রথমেই তিনি সকলকে হজের মূল উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দেন।

তিনি বলেন, ‘হে লোকসকল, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন, তাই তোমরা তা পালন করো।’

নবীজি (সা.) তখন মিম্বরে বসা। লোকেরা তাঁর কাছে হজের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জিজ্ঞেস করতে লাগল। তাঁরা ইহরাম বাঁধার নির্দিষ্ট স্থান বা মিকাত সম্পর্কে জানতে চাইল।

তখন আকরা ইবনে হাবিস (রা.) প্রশ্ন করলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, এটা কি প্রতি বছর করতে হবে?’

নবীজি চুপ থাকলেন। প্রশ্নটি তিনবার করা হলো। তারপর নবীজি বললেন, ‘না। যদি আমি হ্যাঁ বলতাম, তবে তা প্রতি বছরের জন্য ওয়াজিব হয়ে যেত আর তোমরা তা করতে সক্ষম হতে না। তাই আমি যে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া ছেড়ে দিই, তোমরাও তা নিয়ে অধিক প্রশ্ন করো না। তোমাদের পূর্ববর্তীরা অধিক প্রশ্ন আর নবীদের সঙ্গে বিতর্কের কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি তোমাদের যে নির্দেশ দেব, তা সাধ্যমতো আঁকড়ে ধরবে। আর যা নিষেধ করব, তা থেকে বিরত থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৩৭)

নবীজি (সা.) তখন মিম্বরে বসা। লোকেরা তাঁর কাছে হজের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জিজ্ঞেস করতে লাগল। তাঁরা ইহরাম বাঁধার নির্দিষ্ট স্থান বা মিকাত সম্পর্কে জানতে চাইল। তিনি বললেন, ‘মদিনাবাসী ‘জুল-হুলাইফা’ থেকে, শামবাসী ‘জুহফা’ থেকে, নজদবাসী ‘কারনুল মানাজিল’ থেকে এবং ইয়েমেনবাসী ‘ইয়ালামলাম’ থেকে ইহরাম বাঁধবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৩)

খুতবা চলাকালে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, ‘আল্লাহর রাসুল, ইহরামের সময় আমরা কীরকম কাপড় পরব?’

নবীজি উত্তর দিলেন, ‘জামা-পায়জামা ও পাগড়ি-টুপি পরিধান করবে না। তবে কারও যদি জুতা না থাকে, সে যেন মোজা পরে এবং তা টাখনুর নিচের অংশটুকু কেটে নেয়। তোমরা জাফরান ও ওয়ারস (সুগন্ধি) লাগানো কোনো কাপড় পরিধান করবে না। নারীরা নিকাব ও হাতমোজা পরবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৩৮)

সঙ্গে তখন বিশাল এক কাফেলা। নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ—সবাই এ কাফেলার যাত্রী। কেউ বাহনে, কেউ পায়ে হেঁটে। কেউ ভারী বোঝা নিয়ে, কেউ-বা একেবারে হালকা হয়ে।

২৫ জিলকদ, শনিবার। নবীজি (সা.) মসজিদে নববিতে জোহরের চার রাকাত নামাজ আদায় করলেন। তারপর প্রস্তুতি নিয়ে দিনের মধ্যভাগে মদিনা থেকে বের হলেন। আশ-শাজারার পথ ধরে তিনি রওনা হলেন মক্কার দিকে।

নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে তখন বিশাল এক কাফেলা। নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ—সবাই এ কাফেলার যাত্রী। কেউ বাহনে, কেউ পায়ে হেঁটে। কেউ ভারী বোঝা নিয়ে, কেউ-বা একেবারে হালকা হয়ে। নবীজির সঙ্গে হজ পালনের এই বিরল সৌভাগ্য থেকে কেউই বঞ্চিত হতে চাইছেন না।

নবীজি (সা.) আসরের নামাজের আগে ‘জুল-হুলাইফায়’ পৌঁছালেন। সফরের কারণে তিনি আসরের নামাজ কসর হিসেবে দুই রাকাত পড়লেন। কাফেলার লোকজন আকিক উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ল। তিনি রাতটি সেখানেই যাপন করলেন।

সম্ভবত তিনি আগে থেকেই আকিক উপত্যকায় থাকার কথা ভেবে রেখেছিলেন, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকগুলো কাফেলায় শামিল হওয়ার সুযোগ পায়। জায়গাটি প্রশস্ত ও উন্মুক্ত হওয়ায় জনাকীর্ণ মদিনার চেয়ে এখানে অবস্থান করা সবার জন্যই আরামদায়ক ছিল।

নবীজি (সা.) ইহরামের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিলেন, যাতে সবাই অনুভব করতে পারে—এক মাহাত্ম্যপূর্ণ ইবাদতে প্রবেশ করছেন তিনি। তিনি কোরবানির উট আনার নির্দেশ দিলেন। উটের ডান কুঁজে চিহ্ন দিলেন এবং গলায় মালা পরিয়ে দিলেন, যাতে মানুষ ‘হাদি’ (কুরবানির পশু) চিনতে পারে এবং আল্লাহর নিদর্শনের মর্যাদা দেয়।

যে বাহনে চড়ে হজযাত্রা করেছিলেন, সেটি ছিল অতি সাধারণ। তার পিঠে ছিল একটি পুরোনো জিনপোশ ও গদি। ইহরামের পোশাক হিসেবে তিনি যে চাদরটি পরেছিলেন, সেটির মূল্য ছিল মাত্র চার দিরহাম।

তিনি ইহরামের উদ্দেশ্যে গোসল করলেন। খিতমি ও উশনান (মাথা পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত ঘাস) দিয়ে মাথা ধুয়ে সামান্য তেল দিলেন। আয়েশা (রা.)-এর কাছে থাকা সবচেয়ে ভালো সুগন্ধিটি মেখে নিলেন। তাঁর চুলের সিঁথি ও দাড়িতে সেই সুগন্ধির ঝলক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। এরপর জোহরের নামাজ আদায় করে তিনি তাঁর উট ‘কাসওয়ার’ পিঠে আরোহণ করলেন। তখন আল্লাহর প্রতি পরম বিনয় ও নম্রতায় তাঁর মস্তক ছিল অবনত।

নবীজি (সা.) যে বাহনে চড়ে হজযাত্রা করেছিলেন, সেটি ছিল অতি সাধারণ। তার পিঠে ছিল একটি পুরোনো জিনপোশ ও গদি। ইহরামের পোশাক হিসেবে তিনি যে চাদরটি পরেছিলেন, সেটির মূল্য ছিল মাত্র চার দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) বা তারও কম। উট যখন তাঁকে নিয়ে চলতে শুরু করল, তিনি কিবলামুখী হয়ে দোয়া করলেন—‘হে আল্লাহ, এই হজে যেন কোনো লৌকিকতা বা খ্যাতি লাভের আকাঙ্ক্ষা না থাকে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৮৯০)

নবীজি (সা.)-এর আসবাবপত্র এত সামান্য ছিল, আবু বকর (রা.)-এর বোঝা বহনকারী একটি উটেই তা আঁটিয়ে গেল। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও মহান নেতার হজের পাথেয় ছিল এই অতি সামান্যই!

  • মুজিব হাসান: গল্পকার ও সম্পাদক, কেয়ারি