আধুনিক ব্যবস্থাপনার তাত্ত্বিকরা সফলতার জন্য কয়েকটি মৌলিক নিয়ম নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে মার্কিন লেখক স্টিফেন কোভে তাঁর বিখ্যাত বই দ্য সেভেন হ্যাবিটস-এ ‘আগে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা’ (পুট ফার্স্ট থিং ফার্স্ট) নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন।

আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই প্রশাসনিক নিয়ম ইসলামে হাজার বছর ধরে ‘অগ্রাধিকারের ফিকহ’ (ফিকহুল আওলাবিয়াত) নামে প্রচলিত। এটিকে আমলের স্তরবিন্যাসের জ্ঞান (ফিকহুত তারতিব) বলেও অভিহিত করা হয়। এর মূল অর্থ হলো, একাধিক কাজের মধ্যে তুলনা করে কোনটি আগে করা বেশি জরুরি বা গুরুত্বপূর্ণ তা নির্ধারণ করা। সহজ কথায়, ‘কোনটি প্রয়োগের জন্য সবচেয়ে যোগ্য তা জানা’।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এই অগ্রাধিকারের চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায়। তিনি নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আমল কোনটি?’ নবীজি (সা.) ধারাবাহিকভাবে উত্তর দিলেন: ১. সময়মতো নামাজ পড়া। ২. পিতামাতার সেবা করা। ৩. আল্লাহর পথে জিহাদ করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৭)

এখানে রাসুল (সা.) গুরুত্ব অনুসারে আমলগুলোকে বিন্যাস করেছেন। ইসলাম কতটা ইতিবাচক থাকতে বলে। মহানবী (সা.) যখন মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠান, তখন তাকে একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যা অগ্রাধিকারের অনন্য দলিল।

তিনি বলেছিলেন, “তুমি আহলে কিতাবদের কাছে যাচ্ছ। তাই প্রথমে তাদের আল্লাহর একত্ববাদ ও আমার নবুয়তের সাক্ষ্য দিতে আহ্বান জানাবে। তারা যদি তা মেনে নেয়, তবে তাদের জানাবে যে আল্লাহ দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। যদি তা-ও মেনে নেয়, তবে তাদের বলবে যে আল্লাহ তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন, যা ধনীদের কাছ থেকে নিয়ে দরিদ্রদের দেওয়া হবে...।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৯৫)

এই হাদিস থেকে দেখা যায়, নবীজি (সা.) মৌলিক বিশ্বাস (আকিদা)-এর পর ইবাদত এবং তারপর সামাজিক অর্থনীতি (জাকাত)-এর ক্রম নির্ধারণ করেছেন। এটিই প্রকৃত ব্যবস্থাপনা।

বিখ্যাত আলেম ড. ইউসুফ কারাজাভি তাঁর ফিকহুল আওলাবিয়াত গ্রন্থে এই বিষয়টিকে একাধিক স্তরে ভাগ করেছেন। ফিকহ শাস্ত্র কাকে বলে।

  • আদেশ পালনের ক্ষেত্রে: শাখার চেয়ে মূলকে গুরুত্ব দেওয়া, নফল বা সুন্নতের চেয়ে ফরজকে প্রাধান্য দেওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে উম্মাহর স্বার্থকে বড় করে দেখা।
  • সংস্কারের ক্ষেত্রে: বাইরের সমাজ পরিবর্তনের আগে আত্মশুদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়া এবং যুদ্ধের আগে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

স্টিফেন কোভে তাঁর বইয়ে বিষয়গুলোকে সুন্দর ও সহজ কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছেন, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমাদের কাছে এত সমৃদ্ধ সভ্যতা এবং জ্ঞানের উত্তরাধিকার থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা এই ধারণাগুলোকে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে উপস্থাপন করতে পিছিয়ে আছি?

সারকথা, অগ্রাধিকারের জ্ঞান আমাদের শেখায় কীভাবে বিশৃঙ্খলতা এড়িয়ে গুছিয়ে কাজ করতে হয়। আমরা যদি আমাদের এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে আধুনিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারি, তবে তা বিশ্ব ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।