সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) মাত্র ৯ দিনে ৪৭তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ৫০তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফলও ১১ দিনের মধ্যে জানানো হয়েছে। বিসিএস ইতিহাসে এর আগে কখনো এত দ্রুত ফল প্রকাশ হয়নি। এছাড়া বিসিএস আবেদন ফি ২০০ টাকা কমানো হয়েছে এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত সবাই প্রশংসা করছেন। তবে প্রশাসনিক গতিশীলতার পাশাপাশি স্থায়ী সংস্কার ও নন-ক্যাডার নিয়োগের মতো কিছু অমীমাংসিত সমস্যা রয়ে গেছে। সম্প্রতি রাজধানীর এক হোটেলে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে গত ১৮ মাসের সংস্কারের ছবি তুলে ধরে পিএসসি। সেখানে জন–আস্থা ফিরিয়ে আনতে কমিশনের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

বিগত কয়েকটি বিসিএসের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, পিএসসি ফল প্রকাশে নিজেদের রেকর্ড ধারাবাহিকভাবে ভাঙছে। ২০১৯ সালের ৩ মে অনুষ্ঠিত ৪০তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশে ৮৪ দিন লেগেছিল (২৫ জুলাই ২০১৯)। ২০২১ সালের ২৯ অক্টোবরের ৪৩তম বিসিএসের ফল ১০২ দিন পর প্রকাশিত হয় (৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২)। বর্তমান কমিশন অতীতের দেরিতা কাটিয়ে গতি এনেছে। সোহরাব (মো. সোহরাব হোসাইন) কমিশনের ৪৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফল দিতে ২৭ দিন লেগেছিল, কিন্তু মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন ৪৭তম বিসিএসে মাত্র ৯ দিনে ফল দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ৫০তম বিসিএসে ২ লাখ ৯০ হাজার ৯৫১ জন প্রার্থীর প্রিলিমিনারি ফল ১১তম দিনে প্রকাশ করা হয়েছে। পিএসসি সূত্রে বলা হয়েছে, এর পেছনে ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ কাজ করছে। এর লক্ষ্য বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত ফল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া এক বছরে শেষ করা।

পিএসসি সদস্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শুধু কম সময়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, বিষয়টি এভাবে বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বর্তমান কমিশন লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আগে লিখিত পরীক্ষার খাতা দেখতে যেখানে এক বছরের বেশি সময় লাগত, এখন “সার্কুলার ইভাল্যুশন সিস্টেম” চালু করার ফলে তা মাত্র তিন মাসে নামিয়ে আনা হয়েছে। উত্তরপত্রের মার্কিং বৈষম্য দূর করার জন্য বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি প্রশ্নের মানসম্মত উত্তর কী হতে পারে, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করে তার একটি সার্বিক মান নির্ধারণ করেন। সেই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রত্যেক প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। এটি পিএসসির ইতিহাসে ইতিপূর্বে ঘটেনি। আমরা মনে করি, এর ফলে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে মার্কিং বৈষম্যের অবসান হয়েছে এবং মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন হচ্ছে।”

গত এক বছরে ৪৪তম থেকে ৪৯তম বিসিএস পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ৭২৮ জন প্রার্থীকে বিভিন্ন ক্যাডার পদে সুপারিশ করেছে বর্তমান কমিশন। নতুন কমিশন বিসিএস আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় নামিয়েছে। এতে সাধারণ ও অসচ্ছল চাকরিপ্রার্থীরা আর্থিক স্বস্তি পেয়েছেন। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে ১০০-এ নামিয়ে আনাও প্রশংসিত। পিএসসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এতে প্রার্থীদের মানসিক চাপ কমবে এবং লিখিত পরীক্ষার ফল বেশি গুরুত্ব পাবে। ভাইভা বোর্ডে বৈষম্যের সুযোগও কমবে। পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, মৌখিক পরীক্ষায় কম্পিটেন্সি বেজড ইন্টারভিউ পদ্ধতি চালু হয়েছে, যাতে নেতৃত্বগুণসম্পন্ন প্রার্থীরা সিভিল প্রশাসনে যোগ দেবেন।

বিসিএস নিয়োগে জালিয়াতি রোধে পিএসসি ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে। বুয়েটের সহায়তায় সমন্বিত সফটওয়্যার তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রার্থীদের জন্য ‘ইউনিক আইডি’ ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে প্রতিবার নতুন করে তথ্য দিতে হবে না। প্রশ্নপত্রে গোপন বারকোড এবং মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড গঠনে লটারি পদ্ধতি চালু হয়েছে, যা স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে বলে পিএসসি কর্মকর্তারা বলছেন। সিলেবাস হালনাগাদের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পিএসসি ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে সিলেবাস হালনাগাদের ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

পিএসসির কাজে গতি এলেও নন-ক্যাডার নিয়োগের দেরি এখনো রয়েছে। ৪৩ ও ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডারে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা নিয়োগ না পেয়ে আন্দোলনে রয়েছেন। ৪৩তম বিসিএসের এক প্রার্থী বলেন, “কমিশন দ্রুত ফল দিচ্ছে, কিন্তু আমাদের নন-ক্যাডার নিয়োগের বেলায় কেন এত ধীরগতি? সরকারি দপ্তরগুলোতে ৪ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি পদ শূন্য থাকলেও আমরা কেন পথে পথে ঘুরছি?” গত ১৩ এপ্রিলের আলোচনা সভায় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী বলেন, সরকারি চাকরির শূন্য পদ পূরণে সব মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং নন-ক্যাডার থেকে সর্বোচ্চ নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম বলেন, সংবিধান অনুযায়ী পিএসসি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে এর স্বাধীনতা সীমিত। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পিএসসি ২০১১ সালের পর থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি দপ্তরের মতো কাজ করছে। নির্বাচন কমিশনের মতো বিধি প্রণয়নের স্বাধীনতা পিএসসির নেই।” তিনি যোগ করেন, পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা পেলে ‘ওয়ান বিসিএস ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ ধারাবাহিক হবে। আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, বর্তমান সরকার পিএসসিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে না এবং বাজেটের অর্থ একবারে ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনায় আছে। পিএসসি সূত্রে বলা হয়েছে, নতুন উদ্যোগগুলোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ দরকার, নয়তো পরবর্তীতে অব্যাহত রাখা কঠিন হবে।

বিসিএসের চূড়ান্ত পর্যায়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ পড়ার সমস্যা রয়েছে। ৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েও রাজশাহীর পুঠিয়ার এক প্রার্থীর নিয়োগ হয়নি। এ ব্যাপারে উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন দ্রুত করতে সরকার সচেষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, পিএসসিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘সাইকোমেট্রিক টেস্ট’ ও ‘ডিওবি টেস্টিং’ চালু করার ওপর জোর দেন তিনি।

সামগ্রিকভাবে গত ১৮ মাসে পিএসসি যে গতি এনেছে, তা ধরে রাখা এখন চ্যালেঞ্জ। ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ অর্জিত হলে এবং মেধা, সততা ও নৈতিকতার মূল্যায়ন নিশ্চিত হলে জন–আস্থা ফিরবে।