পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসে বিতর্কের মেঘ অতিক্রম করে এসপায়ার পার্টির নেতা লুৎফুর রহমান টানা চতুর্থবার নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। গত শুক্রবার প্রকাশিত ফলাফলে তিনি ৩৫ হাজার ৬৭৯ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলামকে ১৯ হাজার ৪৫৪ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন। কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বরোটিতে মোট ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০ জন এবং ভোট পড়েছে ৪২.১ শতাংশ।
২০১০ সালে প্রথম সরাসরি মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন লুৎফুর রহমান। কিন্তু নির্বাচনের আগে দলটি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দল ত্যাগ করেন তিনি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে ২৩ হাজার ২৮৩ ভোট পেয়ে লেবারের হেলাল আব্বাসকে ৭ হাজার ৩৫২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এরপর থেকে এই লেবারের শক্ত ঘাঁটি বরোতে তিনি কোনো নির্বাচনে হারেননি।
মেয়র নির্বাচনের পাশাপাশি কাউন্সিল নির্বাচনেও এসপায়ার পার্টি বড় সাফল্য অর্জন করেছে। শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, ৪৫ সদস্যের কাউন্সিলে দলটি ৩০টি আসন জিতেছে। এটি রেকর্ড সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
লুৎফুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে এটি ষষ্ঠ জয়। তিনি ২০০২ ও ২০০৬ সালে লেবারের মনোনয়নে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র হয়ে যুক্তরাজ্যের প্রথম মুসলিম নির্বাহী মেয়র এবং প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মেয়র নামে আলোচিত হন। ২০১৪ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। আদালতের রায়ে ২০১৫ সালে পদ হারানোর পর পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০২২ সালে এসপায়ারের হয়ে আবার জয়ী হন।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় সরকারের তদারকির প্রেক্ষাপটে এই জয়ের তাৎপর্য বেড়েছে। শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সরকার ২০২৫ সালে ‘মিনিস্টেরিয়াল এনভয়’ নিয়োগ করে। এদের দায়িত্ব ছিল কাউন্সিলের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, পরামর্শ, চ্যালেঞ্জ এবং সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এতে লুৎফুর রহমানের প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল। তবু সরকারি তদারকি, অতীত বিতর্ক ও জাতীয় চাপ সত্ত্বেও তিনি ভোটারদের আস্থা ধরে রেখেছেন। প্রচারণায় আগের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও কমিউনিটির কল্যাণ ছিল মূল কথা।
তিনি বিনা মূল্যে স্কুল মিল, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের অনুদান, এ লেভেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাভাতা, ফ্রি হোম কেয়ার, ইয়ুথ সার্ভিসে বিনিয়োগ, ফ্রি সুইমিং, কাউন্সিল ঘরবাড়ি উন্নয়ন এবং নতুন আবাসন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর শক্তি বাংলাদেশি ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক, এসপায়ারের ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন এবং স্থানীয় সেবামুখী প্রচারণায়। জাতীয় বিতর্কের বদলে পরিবার, শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও কাউন্সিল সেবার বিষয় তুলে ধরেছেন।
লুৎফুর রহমানের সমর্থকদের মতে, সরকারি তদারকি সত্ত্বেও ভোটাররা স্থানীয় সেবাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে—যেমন বিনা মূল্যে খাবার, শিক্ষাসহায়তা, আবাসন, যুবসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা। ব্রিটিশ স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর ধারাবাহিক সাফল্য বিরল। মূলধারার দলগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে চারবার মেয়র জয় পাওয়া যুক্তরাজ্যের স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী। এটি পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক শক্তির প্রতিফলন।
তিনি সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিনের সমর্থন পেয়ে আসছেন। এবারের প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও করবিন উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাজ্যের ডেইলি ড্যাজলিং ডনের প্রকাশক সাংবাদিক মুনজের আহমদ চৌধুরী বলেন, “এখানে অন্য যাঁরা প্রার্থী ছিলেন, তাঁরা নেতৃত্বের দক্ষতা, কৌশল ও জন–আস্থার বিচারে লুৎফুর রহমানের কাছাকাছি পৌঁছানোর মতো কেউ ছিলেন না। টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশিরা বরাবরই দল নয়, প্রার্থী দেখে ভোট দেন। সে কারণেই লুৎফুর রহমানের এ বিশাল বিজয়।”
জয়ের পর মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে কথায় লুৎফুর রহমান বলেন, “আমাকে ও এসপায়ার দলকে পুনর্নির্বাচিত করায় টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণকে ধন্যবাদ। আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ ও কমিউনিটিকেন্দ্রিক সেবা অব্যাহত রাখব। আমাদের স্লোগান “এসপায়ার ফর ডেলিভারি অ্যান্ড কমিউনিটি” তথা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও কমিউনিটির কল্যাণে এসপায়ার।”
তিনি আরও বলেন, এসপায়ার প্রশাসন দেশের প্রথম কাউন্সিল হিসেবে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য সর্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল এবং এ লেভেল শিক্ষার্থীদের জন্য এডুকেশন মেইনটেন্যান্স অ্যালাউন্স আবার চালু করেছে। নতুন মেয়াদে কম আয়ের পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ট্রাভেল পাস চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
টাওয়ার হ্যামলেটসকে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ও সিটি অব লন্ডনের পর তৃতীয় বৃহৎ স্থানীয় অর্থনৈতিক হাব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কাউন্সিলের বার্ষিক নেট বাজেট ৫০ কোটি পাউন্ডের বেশি। নির্বাহী মেয়র হিসেবে লুৎফুর রহমান কয়েক শ কোটি পাউন্ডের বাজেট, আবাসন, শিক্ষা, সামাজিক সেবা ও স্থানীয় উন্নয়ন নীতির ওপর সরাসরি প্রভাব রাখেন। লন্ডনের ৩২টি বরোর মধ্যে মাত্র ৫টিতে এ ধরনের শক্তিশালী নির্বাহী মেয়রব্যবস্থা রয়েছে।






