ইসলামি জ্ঞানের মূল ভিত্তি কোরআন এবং নির্ভরযোগ্য হাদিস। এ ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু তাফসির, ইতিহাস বা নবীগণের কাহিনি অধ্যয়ন করতে গিয়ে কিছু এমন বর্ণনা পাওয়া যায়, যা কোরআন বা হাদিসে সরাসরি উল্লেখিত নয়। এ ধরনের বর্ণনার উল্লেখযোগ্য অংশকে ‘ইসরায়েলি বর্ণনা’ বা ‘ইসরায়েলি রেওয়ায়েত’ বলা হয়।

এসব বর্ণনায় কিছুতে আংশিক ঐতিহাসিক তথ্য থাকলেও সবগুলোই নির্ভরযোগ্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো বিভ্রান্তি বা ভুল ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রশ্ন ওঠে, ইসরায়েলি রেওয়ায়েত কী এবং এগুলো গ্রহণ বা বর্জনের নীতি কী হওয়া উচিত?

এসব বর্ণনা কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; কিছু সাহাবি ও তাবিয়িদের মাধ্যমে তা তাফসির ও ইতিহাসগ্রন্থেও স্থান পেয়েছে। তবে এগুলো ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করা।

ইসরায়েলি রেওয়ায়েত বলতে বোঝায় সেইসব বর্ণনা, যা নবীদের জীবনকাহিনি, পূর্ববর্তী জাতির ইতিহাস বা সৃষ্টিজগতের অদৃশ্য বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। এসব তথ্য মূলত বনী ইসরায়েল—অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও ইনজিল বা তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতদের সূত্র থেকে প্রচলিত হয়েছে। এ কারণেই এদের ইসরায়েলি রেওয়ায়েত বলা হয়।

পরবর্তী সময়ে এসব বর্ণনা শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; কিছু সাহাবি ও তাবিয়ীর মাধ্যমে তাফসির এবং ইতিহাসগ্রন্থেও এগুলো স্থান পায়। তবে এদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপদেশ ও শিক্ষা নেওয়া।

ইসলামের প্রথম যুগে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আগে আহলে কিতাব ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা পূর্ববর্তী ধর্মের জ্ঞান ও কাহিনি মুসলিম সমাজে বর্ণনা করতেন। ফলে ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারে নতুন কিছু ব্যাখ্যা ও গল্প যুক্ত হয়। কিন্তু তখন এসবের সমস্ত বর্ণনা যাচাইবাছাই হয়নি। তাই পরবর্তীকালের আলেমরা এদের বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন।

কিছু বর্ণনার ক্ষেত্রে ইসলামি উৎসে সমর্থন বা বিরোধিতা কোনোটিই পাওয়া যায় না। এসব ক্ষেত্রে আলেমগণ সাধারণত নীরবতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন।

আলেমরা এসব বর্ণনাকে সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন:

১. শরিয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ: যেসব বর্ণনা কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের সঙ্গে মিলে যায়, সেগুলো গ্রহণযোগ্য। তবে এগুলো স্বতন্ত্র দলিল নয়, বরং সম্পূরক তথ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।

২. শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক: কোরআন বা নির্ভরযোগ্য হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বর্ণনা সম্পূর্ণ বর্জনীয়। বিশেষ করে যেগুলো নবীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, সেগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

৩. অপ্রমাণিত: ইসলামি উৎসে সমর্থন বা বিরোধিতা না থাকলে আলেমরা নীরবতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। অর্থাৎ এগুলোকে সত্য বা মিথ্যা বলে নিশ্চিত করা যায় না।

ইসরায়েলি রেওয়ায়েতের প্রধান সমস্যা হলো, অনেকের নির্ভরযোগ্য সনদ নেই। ফলে এতে কল্পনা, অতিরঞ্জন বা ভুল তথ্য মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে যে বিভ্রান্তি হতে পারে:

  • নবীদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়া।
  • অদ্ভুত বা ভিত্তিহীন গল্পে মনোযোগ চলে যাওয়া।
  • ইসলামের মূল ও বিশুদ্ধ শিক্ষার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হওয়া।
ইসরায়েলি রেওয়ায়েত ইসলামি জ্ঞানচর্চার একটি সহায়ক অনুষঙ্গ মাত্র; এটি কখনোই মূল উৎস নয়।

চেনার উপায়

  • উৎস যাচাই: কোনো কাহিনি কোরআন বা নির্ভরযোগ্য হাদিসে না থেকে পূর্ববর্তী ধর্মীয় কাহিনির সঙ্গে হুবহু মিললে তা ইসরায়েলি রেওয়ায়েত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • আলেমদের ব্যাখ্যা: হাদিসবিশারদ ও গবেষকরা এসবের পাশে মন্তব্য করে থাকেন কোনটি গ্রহণযোগ্য।
  • অস্বাভাবিকতা: অবাস্তব ঘটনা বা অতিরিক্ত কল্পনাপ্রসূত উপাদানযুক্ত গল্প যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।

ইসরায়েলি রেওয়ায়েত ইসলামি জ্ঞানচর্চার সহায়ক অংশ মাত্র; এটি কখনো মূল উৎস নয়। ইসলামের মৌলিক উৎস কোরআন ও রাসুলুল্লাহর (সা.) হাদিস। তাই এসব পড়ার সময় গ্রহণ-বর্জনের সীমা সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার।

(সূত্র: আল-ওয়াজউ ফিল হাদিস, পৃষ্ঠা: ৩৩০-৩৩২, বৈরুত, ১৯৮১)

  • রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক