২০২২ সালে শিবন জিলিস ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী হিসেবে কাজ করছিলেন এবং ওপেনএআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। তখন তিনি একটি বড় গোপন তথ্য লুকিয়ে রেখেছিলেন—তাঁর সন্তানদের বাবা ইলন মাস্ক। এক বছর আগেই তাঁদের যমজ সন্তানের জন্ম হয়। এখন টেসলা সিইও ইলন মাস্কের সঙ্গে জিলিসের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং এআই বিপ্লবের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের মধ্যকার আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ৬ মে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতে জিলিসের দেওয়া সাক্ষ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে। তিনি সংকটের সময়ে ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের নেতৃত্বের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিলেন।
গত মাসের শেষ দিকে ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং অন্যতম অর্থদাতা ইলন মাস্ক প্রতিষ্ঠানটি ও এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মাস্কের অভিযোগ, স্যাম অল্টম্যান ও অন্যরা তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। জনকল্যাণমূলক অলাভজনক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের আর্থিকভাবে লাভবান করার জন্য লাভজনক কাঠামো তৈরি করা হয় ওপেনএআইকে। জিলিস শুরুতে এই মামলায় মাস্কের সঙ্গে সহ-বাদী ছিলেন, কিন্তু বিচার শুরুর আগে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন।
ওপেনএআই মাস্কের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, মাস্ক নিজেই বিভিন্ন সময়ে ওপেনএআইকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চাপ দিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ, মাস্ক প্রতিষ্ঠানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ায় এই মামলা করেছেন। ২০১৮ সালে মাস্ক ওপেনএআই ত্যাগ করেন। বর্তমানে তাঁর নিজস্ব এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআই নিয়ে কাজ করছেন।
আদালতে পেশ করা প্রমাণ অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের পরিচালনা পর্ষদে থাকাকালে জিলিস জানতেন মাস্ক একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি চালু করার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর একটি মেসেজে লেখা ছিল, ‘যখন তোমার সন্তানদের বাবা একটি প্রতিদ্বন্দ্বী উদ্যোগ শুরু করে এবং ওপেনএআই থেকে লোক নিয়োগ করার চেষ্টা করেন, তখন আর কিছুই করার থাকে না।’ আদালত এই মেসেজকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
২০১৭ সালের দিকে ওপেনএআইয়ের অর্থায়নের সংকট নিরসনের জন্য টেসলার সঙ্গে একীভূত হওয়া বা লাভজনক কাঠামো তৈরির বিষয়ে জিলিস ও মাস্কের মধ্যে আলোচনা হয়। এখন ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, জিলিস ও মাস্ক শুরু থেকেই লাভজনক কাঠামোর পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে মাস্কের আইনজীবীরা জিলিসের সাক্ষ্যের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, তিনি নিজেও মনে করতেন ওপেনএআই মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
২০১৮ সালে মাস্ক বোর্ড ত্যাগ করার পর জিলিস তাঁকে মেসেজ করেছিলেন, ‘তুমি কী চাও? আমি ওপেনএআইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে তথ্যের প্রবাহ চালু রাখি, নাকি সম্পর্ক ছিন্ন করব?’ ইলন মাস্ক তাঁকে সম্পর্ক বজায় রাখতে বলেছিলেন। তখন ইলন ওপেনএআইয়ের কয়েকজন কর্মীকে টেসলাতে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন।
ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান গত সোমবার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, জিলিস তাঁদের বলেছিলেন, মাস্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল অবৈষয়িক বন্ধুত্বের। ফলে বোর্ড তাঁকে সদস্য হিসেবে থাকতে দেয়। ব্রকম্যানসহ সবাই জিলিসের ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীরতা সম্পর্কে অনেক পরে জানতে পারেন।
জিলিস তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, মাস্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বোর্ড সদস্য হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলেনি। তবে মাইক্রোসফটের ১ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ এবং ২০২৩ সালে স্যাম অল্টম্যানকে সিইও হিসেবে পুনরায় ফিরিয়ে আনার পেছনে মাইক্রোসফটের সম্পৃক্ততা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। জিলিস বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল, মানবতার কল্যাণের জন্য আমরা অলাভজনক কাঠামো নিয়ে যা গড়ে তুলেছিলাম, তা যেন ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।’
শিবন জিলিস মাস্কের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে থেকেই একজন সফল ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ছিলেন। ২০১৬ সালে ওপেনএআইয়ের উপদেষ্টা হিসেবে মাস্কের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তিনি টেসলা, নিউরালিংক এবং এক্সএআইতে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন। মাস্ক তাঁকে তাঁর চিফ অব স্টাফ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২০ সালের শেষের দিকে মাস্ক তাঁকে সন্তান গ্রহণের প্রস্তাব দেন। জিলিস জানান, মাস্ক তাঁর চারপাশের সবাইকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করতেন এবং নিজেই স্পার্ম ডোনার হওয়ার প্রস্তাব দেন। ২০২১ সালে আইভিএফ পদ্ধতিতে তাঁদের যমজ সন্তানের জন্ম হয়। একটি গোপন চুক্তির কারণে জিলিসের বাবাও জানতেন না যে এই সন্তানদের পিতা কে। ২০২২ সালে বিজনেস ইনসাইডার খবরটি ফাঁস করে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের আরও দুই সন্তানের জন্ম হয়। আদালতে মাস্ক জিলিসকে তাঁর সঙ্গী হিসেবে সম্বোধন করেছেন। বর্তমানে তাঁরা টেক্সাসের অস্টিনে বসবাস করেন এবং ভ্রমণের সময়ও একসঙ্গে থাকেন।
এখনো মামলা নিয়ে আলাপ চলছে। এই মামলার রায় এআই প্রযুক্তির দৌড়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মাস্ক যদি জয়ী হন, তবে বিচারক ওপেনএআইকে পুনরায় অলাভজনক কাঠামোতে ফিরে যেতে এবং অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকে বোর্ড থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারেন।
সূত্র: সিএনএন






