যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আলি মারিজ আল-বাহাদলি এবং ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীর কয়েকজন নেতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। দেশটির অর্থ বিভাগের বক্তব্য, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে তারা ইরানকে তেল বিক্রিতে সাহায্য করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘ইরানি শাসকগোষ্ঠী দুর্বৃত্ত চক্রগুলোর মতো ইরাকি জনগণের বৈধ সম্পদ লুট করছে। ইরান তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরাকের তেলকে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের জন্য কাজে লাগাচ্ছে। এটা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা তা নীরবে মেনে নেব না।’
গত বৃহস্পতিবার এই নিষেধাজ্ঞা জারির পর ইরাক বা ইরান কোনো পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতে জড়িত।
ইরাকের বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে ২০০৩ সালের আগে, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানে সাদ্দাম হোসেনের পতনের আগে ইরানে থাকতেন। ওই সময় ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়নের মাধ্যমে ইরাকে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ করে নিয়েছিল তেহরান। এসব গোষ্ঠীর অনেকেরই এখন রাজনৈতিক শাখা রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রয়েছে। ওয়াশিংটন অভিযোগ করে যে বাগদাদ তেহরানের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘ইরানপন্থী’ নুরি আল-মালিকি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে পারে। পরবর্তীতে আল-মালিকি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান।
নিষেধাজ্ঞা কাদের ওপর
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম আলি মারিজ আল-বাহাদলির। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরাকের তেল ব্যবস্থাপনায় কাজ করে আসছেন। প্রথমে ইরাকের পার্লামেন্টের তেল ও গ্যাস কমিটির প্রধান ছিলেন। পরে তেল মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেন এবং ২০২৪ সাল থেকে উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যান্য নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত ব্যক্তিরা হলেন মুস্তফা হাশিম লাজিম আল-বাহাদলি, আহমেদ খুদাইর মাকসুস ও মোহাম্মদ ইসা কাদিম আল-শুয়াইলি। এদের মধ্যে আল-বাহাদলিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরান-সমর্থিত আসাইব আহল আল-হক আন্দোলনের ‘নেতা ও অর্থনৈতিক কর্মকর্তা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খুদাইর মাকসুস ও আল-শুয়াইলি ইরানপন্থী সংগঠন কাতাইব সাইয়্যিদ আল-শুহাদার শীর্ষ কর্মকর্তা।
মার্কিন অর্থ বিভাগ অভিযোগ করে যে আল-বাহাদলি ‘তেল চোরাচালানের অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ’ করতেন এবং ইরান ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি ইরান থেকে তেল পরিবহনের চুক্তি নিয়ে আলোচনাও করতেন। মাকসুস ও আল-শুয়াইলির বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র কেনার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে তারা কেউই কোনো মন্তব্য করেননি।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরাককে ব্যবহার করছে ইরান?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের যুক্তি অনুসারে, আল-বাহাদলি ইরাকের তেল অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এতে ইরান-সংশ্লিষ্ট এক তেল পাচারকারী এবং আসাইব আহল আল-হক গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, সেই পাচারকারী ইরানের তেলকে ‘ইরাকি তেল’ লেবেল করে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আরও জানিয়েছে, ইরাক সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এই চোরাচালান চালিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। আল-বাহাদলি এই কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। ইরাকের তেলমন্ত্রী হায়ান আবদেল-গনি গত মার্চে বলেছিলেন, ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ভুয়া ইরাকি নথি ব্যবহার করেছিল।
নিষেধাজ্ঞাটি এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত। ইরানের প্রতিবেশী দেশ ইরাক সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে আছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরানের বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছে বাগদাদ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইরান একটি তেল চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে বছরে অন্তত ১০০ কোটি ডলার আয় করে বলে ধারণা করা হয়। এই চক্র ইরাকি অ্যাসফল্ট (মিশ্র খনিজ) কারখানা থেকে ইরানি জ্বালানি সরিয়ে নিয়ে তা ইরাকি তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ‘পুরোপুরি ইরাকি’ হিসেবে রপ্তানি করে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরাকে রপ্তানির মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক মুদ্রা অর্জন করে এবং মার্কিন ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা এড়ায়।
ইরানি তেলে যুক্তরাষ্ট্রের কী নিষেধাজ্ঞা
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ মনে করে, যার লক্ষ্য তেহরানকে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরিয়ে নেন। এতে ইরান বিশ্ববাজারে তেল বিক্রির সুযোগ হারায়, যদিও কিছু দেশকে সীমিত অনুমতি দেওয়া হয়।
ট্রাম্পের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখেন। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে আরও কঠোর করেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে। তেল ইরানের প্রধান সম্পদ; বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় তেল উত্তোলনকারী দেশ হিসেবে মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ এবং বাজেটের এক-চতুর্থাংশ আসে তেল থেকে।
ইরাক-ইরানের সম্পর্ক কী
ইরাক ও ইরানকে এখন ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হয়। বাগদাদে ইরানপন্থী ‘কো–অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ জোট ক্ষমতায়, যা ইরাকের শিয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে এবং তেহরানের সঙ্গে ধর্মীয়-রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
ইরাকের বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে ২০০৩ সালের আগে ইরানে ছিলেন। তখন তেহরান ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া অর্থায়ন করে ইরাকে প্রভাব বিস্তার করে এবং এসব গোষ্ঠীর অনেকের রাজনৈতিক শাখা গড়ে ওঠে। এই গোষ্ঠীগুলো তেল খাতসহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে ইরানকে ‘ছায়া অর্থনীতি’ তৈরি করতে সাহায্য করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী অর্থায়ন করে। তবে ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না, কারণ ওয়াশিংটন সামরিক-অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়। ট্রাম্প আল-মালিকিকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে বিরত রেখে নতুন প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদিকে সমর্থন দিয়েছেন।






