দেশের নার্সারিগুলোতে উৎপাদিত গাছের চারা প্রচলিত কৃষিপণ্যের বাইরে রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা জাগিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এই খাতে ধস নেমেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে প্রায় দেড় লাখ মার্কিন ডলারের চারা রপ্তানি হলেও পরের বছর তা নেমে আসে ১১ হাজার ডলারে। রপ্তানিকারকেরা এই পতনের জন্য রপ্তানি প্রক্রিয়ার জটিলতা, সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার অভাবকে দায়ী করছেন।

২০১৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) রপ্তানি শুরুর পর বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারার বিশ্বের সাতটি দেশে বাজার গড়ে উঠেছিল। এর মধ্যে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এছাড়া মালদ্বীপ, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রেও চারা রপ্তানি হয়েছিল। তবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রপ্তানি দেশ সংখ্যা কমে শুধু কাতার ও ওমানে সীমাবদ্ধ হয়।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২০–২১ অর্থবছরে ৪৮ হাজার ডলার সমমূল্যের চারা রপ্তানি হয়। ২০২১–২২ অর্থবছরে তা ৩৯ হাজার ৬০১ ডলার, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৮৫০ ডলার এবং সর্বোচ্চ ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩২ ডলার। সর্বশেষ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এটি নেমে ১১ হাজার ৩৬৫ ডলারে।

ফলের চারার মধ্যে রপ্তানি হয় আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লেবু, বরই, কতবেল, কামরাঙা, কলা, সফেদা, আতা, নারকেল, ডালিম, শরিফা, লিচু, লটকন, বাতাবি লেবু ও জামরুল। গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, বকুল, টগর, রক্তশিমুল, বেলি, গোলাপ, কামিনী, কাঠগোলাপ, জবা ফুলের পাশাপাশি পানগাছের চারাও আছে রপ্তানির তালিকায়।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১ লাখ ১২ হাজার ৮৭২টি চারা রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো জানাচ্ছে, এতে আয় হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। দেশের সাতটি প্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরে গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৯ হাজার চারা রপ্তানি করেছে। বিভিন্ন ফল, ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা এভাবে রপ্তানি হয়েছে।

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, চারা মূলত দুই পদ্ধতিতে রপ্তানি হয়। একটি বেয়ার রুট পদ্ধতি, যেখানে চারার মূল থেকে মাটি পরিষ্কার করে বিমানে নেওয়া হয়। এতে শাকসবজির তুলনায় ভাড়া বেশি পড়ে, কারণ প্যাকেজিংয়ের আয়তনভিত্তিক ভাড়া নির্ধারিত। অন্যটি কোকোপিট পদ্ধতি, যেখানে চারার মূল নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি কোকোপিটে মুড়িয়ে গ্রিনহাউসে সংরক্ষণ করে পরে সমুদ্রপথে রপ্তানি করা হয়।

সরকার কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেয়। চারা কৃষিপণ্য হিসেবে প্রণোদনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এ প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা পিছিয়ে পড়ছে।
শামছুল আলম, কুমিল্লার গ্রীন ওয়ার্ল্ড নার্সারির মালিক

কুমিল্লার গ্রীন ওয়ার্ল্ড নার্সারির মালিক শামছুল আলম বাংলাদেশ থেকে প্রথম চারা রপ্তানি করেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিমানপথে ফ্রেইট চার্জ বেশি এবং কোকোপিটের সংকট প্রধান সমস্যা। বাংলাদেশে নারকেল ডাব হিসেবে বিক্রি হয়ে যায়, ফলে ভারত থেকে আমদানি করতে হয় যাতে কেজিপ্রতি ২ টাকা ৭৩ পয়সা শুল্ক পড়ে। এতে খরচ বাড়ে। সরকারি প্রণোদনা না পাওয়া, রপ্তানি মেলায় চারা অন্তর্ভুক্ত না হওয়া, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কনটেইনারের অভাবও বড় বাধা। এসব কারণে রপ্তানিকারকেরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।

২০১৯ সালে ইউএই-তে রপ্তানি শুরুর পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলেন তৎকালীন দুবাই দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর কামরুল হাসান, যিনি এখন কৃষি মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব। তিনি বলেন, আরবীয়দের মধ্যে বাংলাদেশের চারার চাহিদা আছে, কিন্তু মাটি নিষিদ্ধ হওয়ায় কোকোপিট ব্যবহার করতে হয় যা পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না। শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানির সুযোগ আছে। সরকারের ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা এবং রপ্তানির সম্ভাবনায় হর্টিকালচার খাতে বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রপ্তানিকারকেরা যদি আমাদের কাছে একটা আবেদন দেয়, তাহলে আমরা সেটা পণ্য প্রদর্শনীর তালিকায় যুক্ত করে নেব। আমরা চাই, বাংলাদেশের নতুন নতুন পণ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাক, বাজার তৈরি হোক।
মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেন, পরিচালক (মেলা ও প্রদর্শনী), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো

শামছুল আলম ২০১০ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে হস্তশিল্প রপ্তানি করছেন। ২০১৮ সালে কাতারে চারা আমদানির খবর পেয়ে এ খাতে প্রবেশ করেন। কিন্তু ফাইটোস্যানিটারি সনদ পেতে ছয় মাস অপেক্ষা করতে হয়, কারণ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রথমে জানত না কীভাবে দিতে হয়। তিনি বলেন, নীতিসহায়তা পেলে প্রতি বছর ১০ জন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং খাতটি বড় আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বে নেদারল্যান্ডস এ খাতে শীর্ষে, যারা ১২০টি দেশে বছরে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি করে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩৪ হাজার ডলারের তুলনায় নেদারল্যান্ডস ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ধীরে ধীরে এটি বাড়ানো যেতে পারে যদিও বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় পাঁচ হাজার কোটি ডলারের মতো।