চীনা আতশবাজির একটি বাক্সে ছাপা রয়েছে ২০২৪ সালে হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে ধরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি। পাশে মার্কিন পতাকা। আর নিচে লেখা—‘আমেরিকার জন্য লড়ো’।

কিছু আতশবাজির বাক্সে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ লেখাও চোখে পড়ছে।

চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর লিলিংয়ের ব্ল্যাক স্করপিও ফায়ারওয়ার্কসের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক ব্যবসা ব্যবস্থাপক উইলসন লাম বলেন, এবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন গত বছরের তুলনায় ‘অনেক বেশি জমকালো’ হতে যাচ্ছে।

প্রতিবছরের মতো আগামী ৪ জুলাই দিবসটি নানা আয়োজনে উদযাপিত হবে। লাম জানান, গত বছর শুল্কহার ১০০ শতাংশ পয়েন্টের বেশি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনকারীরা চরম সংকটে পড়েছিলেন। তবে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পর এবছর তাঁর প্রতিষ্ঠানে মার্কিন গ্রাহকদের আতশবাজির ক্রয়াদেশ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

লিলিং অঞ্চলটি ১ হাজার ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে আতশবাজি তৈরির জন্য বিখ্যাত। শুরুতে ‘অশুভ আত্মা’ তাড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব আতশবাজি ব্যবহার করা হতো। এখন এটি বিশাল এক শিল্পে পরিণত হয়েছে। সেখানকার তিন দশকের পুরোনো ব্ল্যাক স্করপিও ফায়ারওয়ার্কস প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের প্রতিনিধিত্ব করছে।

লাম বলেন, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় নির্ধারিত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর কয়েক সপ্তাহ আগে এই সফর বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির দেশ কতটা গভীরভাবে পারস্পরিকভাবে সম্পৃক্ত, তারই প্রতিফলন।

চীনের রপ্তানি করা আতশবাজির প্রায় ৪০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। ঈগল থেকে শুরু করে স্ট্যাচু অব লিবার্টি—বিভিন্ন মার্কিন জাতীয় প্রতীকে মোড়ানো আতশবাজির বাক্সের স্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে লাম বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও ঝগড়া হয়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা একে অপরকে ছাড়া চলতে পারি না। কারণ, আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।’

লাম জানান, আগামী ৪ জুলাইয়ের অধিকাংশ চালান ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে অথবা পথে রয়েছে। তাই সম্প্রতি এই এলাকার একটি কারখানায় প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের পর নিরাপত্তা পরিদর্শনের জন্য সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ হলেও আতশবাজি সরবরাহে বিলম্ব হবে না।

অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক আতশবাজি বিক্রির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিল চীনের দখলে। তবে এর বাজারমূল্য আগের বছরের ১১৬ কোটি ডলার থেকে কমে ১১৪ কোটি ডলারে নেমে আসে।

সাধারণত ৪ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানের জন্য এপ্রিলেই চালান পাঠানো হয়। কিন্তু গত বছর ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কহার ১৪৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়। পরে অবশ্য চীনের পাল্টা ব্যবস্থার মুখে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওয়াশিংটন সেই বাণিজ্যিক বাধা কমাতে বাধ্য হয়। স্বাধীনতা দিবসের পর পাঠানো ব্ল্যাক স্করপিওর আতশবাজিগুলো পরে নববর্ষসহ অন্যান্য উৎসবে ব্যবহার করা হয়।

ব্ল্যাক স্করপিওর কারখানাগুলো চীনের হুনান ও জিয়াংসি প্রদেশের ‘ফায়ারওয়ার্কস করিডর’-এ অবস্থিত। সেখানে শ্রমিকেরা বেশির ভাগ আতশবাজি হাতে তৈরি করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই শিল্পে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

কারখানাগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল আসে লিউইয়াং শহর থেকে। প্রায় ১৫ লাখ মানুষের এই শহরে রয়েছে চার শতাধিক আতশবাজির দোকান। নিয়মিত আতশবাজি উৎসবের কারণে লিউইয়াংসহ পাশের ছোট শহর পিংশিয়াংয়ে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে।

পিংশিয়াংয়ের শেংডিং ফায়ারওয়ার্কস কারখানার প্রতিষ্ঠাতা লিউ ফাংগুও। তিনি বলেন, শুল্কজনিত ঝামেলা এড়াতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বদলে অন্য বাজারে রপ্তানিতে বেশি জোর দিয়েছেন। তাঁর জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল বেশ কষ্টকর। লিউ ফাংগুও বলেন, ‘আমরা সব ধরনের চেষ্টা করেছি—দেশীয় বাজারে বিক্রি বাড়ানো কিংবা অন্য দেশে রপ্তানি করার। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু শুল্কের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।’

চীনের বাণিজ্যিক কেন্দ্র সাংহাইয়ে অবস্থিত আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এরিক ঝেং বলেন, তাঁদের সদস্যরা এখনো আশঙ্কা করছেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আবার খারাপ হতে পারে। তবে বেশির ভাগই মনে করছেন, ট্রাম্পের এই সফর অন্তত দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যযুদ্ধের সাময়িক ‘যুদ্ধবিরতি’ দীর্ঘায়িত করবে। ঝেং বলেন, ‘চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে মার্কিন ক্রেতারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ, তাঁরা চীনের ভালো মানের সাশ্রয়ী পণ্য চান— তা আতশবাজি হোক, পোশাক হোক বা জুতা।’