বুক জ্বালাপোড়া বা খাবার গিলতে সামান্য অসুবিধা অনুভব করলে অনেকে এটাকে সাধারণ অ্যাসিডিটি মনে করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টাসিড ওষুধ খেয়ে সমস্যা চাপা দেন। কিন্তু এই লক্ষণগুলো খাদ্যনালির ক্যানসার বা অ্যাসোফিজিয়েল ক্যানসারের প্রথম সংকেতও হতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্ট ক্যানসারের মধ্যে এটি অন্যতম। তবে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসায় এই মারাত্মক রোগের পথ সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া সম্ভব।
এসকেএফ অনকোলজি আয়োজিত ‘বিশ্বমানের ক্যানসার-চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় এসব তথ্য তুলে ধরেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মেডিকেল অনকোলজিস্ট ডা. এ টি এম কামরুল হাসান। নাসিহা তাহসিনের সঞ্চালনায় গত সোমবার এই অনুষ্ঠানটি মুক্তকণ্ঠ ও এসকেএফ অনকোলজির ফেসবুক পেজে সরাসরি প্রচারিত হয়।
খাদ্যনালির ক্যানসারের ভয়াবহতা ও ঝুঁকি
ডা. এ টি এম কামরুল হাসান জানান, আলজিহ্বার পেছন থেকে পাকস্থলী পর্যন্ত অংশটিই খাদ্যনালি। গ্লোবোক্যান ২০২২-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খাদ্যনালির ক্যানসার বিশ্বে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ রোগে আক্রান্ত ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ চিকিৎসার আগেই বা রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর শনাক্ত হয়। নারীপুরুষ নির্বিশেষে রোগটি হলেও পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি মহিলাদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি প্রায় সাড়ে চার গুণ এবং অ্যাডিনোকার্সিনোমার ক্ষেত্রে আট গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
ক্যানসারের ধরন ও অভ্যন্তরীণ কারণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ক্যানসারকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়: স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা ও অ্যাডিনোকার্সিনোমা। স্কোয়ামাস সেল ক্যানসারের প্রধান কারণ ধূমপান, অ্যালকোহল ও এইচপিভি ভাইরাস। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার কারণে বুক জ্বালাপোড়া বা ‘জার্ড’ রোগে আক্রান্তদের অ্যাডিনোকার্সিনোমা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া ‘ব্যারেট এসোফেগাস’ নামক জেনেটিক অবস্থায় ক্যানসারের ঝুঁকি ২৫ থেকে ১৩০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পান, জর্দা, সাদা পাতা বা গুলের ব্যবহার এবং অতিরিক্ত গরম খাবার খাওয়া খাদ্যনালির পাতলা আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যানসারের পথ সহজ করে।
লক্ষণ ও প্রাথমিক সতর্কসংকেত
খাদ্যনালির ক্যানসারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এটি প্রায়ই নীরবে ছড়িয়ে পড়ে। খাদ্যনালি স্থিতিস্থাপক হওয়ায় তিন ভাগের এক ভাগ আক্রান্ত না হলে রোগী খাওয়ার কষ্ট বোঝেন না। প্রধান লক্ষণ খাবার গিলতে বাধা পাওয়া বা গলায় আটকে যাওয়ার অনুভূতি। শুরুতে শক্ত খাবারে সমস্যা হলেও পরে তরল খাবার গিলতেও কষ্ট হয়। দীর্ঘদিনের বুক জ্বালাপোড়া, অনবরত কাশি, রাতে ঘুমের সময় মুখ দিয়ে খাবার বা জল উঠে আসা এবং দ্রুত ওজনহ্রাসও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। খাদ্যনালি ও শ্বাসনালি কাছাকাছি থাকায় ক্যানসার ছড়ালে ফিস্টুলা তৈরি হয়, যাতে খাওয়ার সময় প্রচণ্ড কাশি হয়।
গরম খাবার ও খাদ্যাভ্যাসের ঝুঁকি
ডা. এ টি এম কামরুল হাসান জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেন। ইরান ও রাশিয়ার এশীয় অঞ্চলের গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরম চা, কফি বা খাবার খাওয়া এই ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক বাড়ায়। খাদ্যনালির ওপরের পাতলা মিউকোসা নিয়মিত অতিরিক্ত তাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ‘ডিসপ্লাসিয়া’র মাধ্যমে ক্যানসার সৃষ্টি করে। ব্যস্ত জীবনে প্রসেসড ফুড বা ফাস্টফুডের নির্ভরতা এবং শাকসবজি-ফাইবারযুক্ত খাবারের অভাবকেও তিনি বড় ঝুঁকি বলে চিহ্নিত করেন।
রোগ নির্ণয় ও বায়োপসি নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা
সঠিক নির্ণয়ের জন্য এন্ডোস্কপি ও বায়োপসি জরুরি। ডা. এ টি এম কামরুল হাসান বলেন, "বায়োপসি করলে ক্যানসার ছড়িয়ে যায়, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।" দক্ষ চিকিৎসক বিশেষ পদ্ধতিতে টিস্যু সংগ্রহ করেন, যাতে ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এন্ডোস্কপির পাশাপাশি সিটি স্ক্যান, পিইটি স্ক্যান বা বোন স্ক্যানে রোগের বিস্তার পরীক্ষা করা হয়।
আধুনিক চিকিৎসা ও নিরাময়ের সম্ভাবনা
ডা. এ টি এম কামরুল হাসান জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে শতভাগ সুস্থ হওয়া সম্ভব। চিকিৎসার প্রধান ধাপ সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি। বাংলাদেশে এখন ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপি উপলব্ধ। ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী কেমোথেরাপি দিয়ে টিউমার ছোট করে অস্ত্রোপচার করা হয় বা রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দক্ষ চিকিৎসক ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিশ্বমানের চিকিৎসা সম্ভব।
শেষে ডা. এ টি এম কামরুল হাসান পরামর্শ দেন, কোনো শারীরিক লক্ষণ অবহেলা করবেন না। সুষম খাবার, দেশীয় শাকসবজি-ফলমূল খাওয়া এবং খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর ঘুমানো ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাঁর মতে, সচেতনতাই ক্যানসারমুক্ত জীবন উপহার দিতে পারে।






