ইলন মাস্ক ওপেনএআইকে লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তরিত করার পক্ষে সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে তিনি কোম্পানির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন, যাতে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আট হাজার কোটি ডলার সংগ্রহ করতে পারেন। গত মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে সাক্ষ্যে এসব তথ্য জানান ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান।
ইলন মাস্ক ওপেনএআই এবং এর কর্তৃপক্ষদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে মামলা করেছেন। গত সপ্তাহে এই মামলার বিচার শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার এই মামলায় সাক্ষ্য দেন ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান। এই মামলা ওপেনএআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
২০২২ সালের শেষের দিকে ওপেনএআইয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি চালু হওয়ায় বিশ্বব্যাপী উন্মাদনা সৃষ্টি হয়।
আদালতে ব্রকম্যান বলেন, ওপেনএআই ২০২৬ সালে কম্পিউটিং রিসোর্সের জন্য পাঁচ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে।
মাস্কের অভিযোগ, ওপেনএআই এবং প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান তাঁকে প্রতারিত করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিতে রাজি করিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারা দাতব্য লক্ষ্য ত্যাগ করে নিজেদের আর্থিক লাভের জন্য এটিকে মুনাফামুখী কোম্পানিতে রূপান্তরিত করেছে।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক এখন ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৫ হাজার কোটি ডলার দাবি করছেন এবং অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওপেনএআইয়ের বোর্ড থেকে সরে যান।
নিজের দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যে ব্রকম্যান বলেন, ২০১৭ সালে মাস্ক চেয়েছিলেন ওপেনএআই কর্পোরেট কাঠামো পরিবর্তন করুক। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মডেল তৈরির জন্য তখন যে পরিমাণ অর্থ লাগছিল, তা অলাভজনক সংস্থা থেকে সংগ্রহ করা কঠিন ছিল।
ব্রকম্যান বলেন, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এমন হলে তিনি ওপেনএআইয়ের নেতৃত্বে আসতে চান। অল্টম্যান ছিলেন মাস্কের একমাত্র বিকল্প।
আদালতে ব্রকম্যান ২০১৭ সালের এক বৈঠকের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, সেই বৈঠকে মাস্ক বলেছিলেন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি ওপেনএআইয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা পাওয়ার যোগ্য।
ব্রকম্যানের দাবি, বৈঠকে মাস্ক আরও বলেছিলেন, ওই মালিকানা ব্যবহার করে তিনি মঙ্গল গ্রহে স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর গড়তে চান।
ব্রকম্যান বলেন, ‘তিনি (মাস্ক) বলেছিলেন, মঙ্গল গ্রহে একটি শহর তৈরি করতে তাঁর আট হাজার কোটি ডলার দরকার। তাই শেষ পর্যন্ত তিনি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণই চেয়েছিলেন। এ ছাড়া সেই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তিনি কবে ছেড়ে দেবেন, সে সিদ্ধান্তও মাস্ক নিজেই নেবেন বলেছিলেন।’
২০১৭ সালের আগস্টের বৈঠকটি ভালোভাবে শুরু হয়েছিল বলে জানান ব্রকম্যান। তিনি বলেন, মাস্ক কয়েকদিন আগে ওপেনএআইয়ের কয়েক কর্মীকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ টেসলা উপহার দিয়েছিলেন। ওপেনএআইয়ের সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ইলিয়া সাৎস্কেভার কৃতজ্ঞতায় মাস্ককে একটি টেসলার ছবি এঁকেছিলেন।
কিন্তু ওপেনএআইয়ের সম্ভাব্য শেয়ারকাঠামো নিয়ে আলোচনায় মাস্ক রেগে যান। ব্রকম্যান বলেন, মাস্ক তা পছন্দ করেননি এবং বলেছিলেন, ‘আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি।’
ব্রকম্যান আরও বলেন, বৈঠকের সেই পর্যায়ে মাস্ক উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে দ্রুত এগিয়ে এসেছিলেন, যাতে তাঁর ভয় হয়েছিল মাস্ক আঘাত করতে পারেন। তবে মাস্ক শেষে ইলিয়া সাৎস্কেভারের আঁকা ছবিটি তুলে নিয়ে রাগে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন এবং বলেন, বিষয়গুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি নতুন অর্থায়ন বন্ধ রাখবেন।
এদিন মাস্কের আইনজীবীরা ব্রকম্যানকে এমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন যেন তিনি ওপেনএআইয়ের মাধ্যমে অর্থ লাভকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
আগের দিন সোমবার ব্রকম্যান বলেন, ওপেনএআইয়ে তাঁর শেয়ারের মূল্য প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার। এছাড়া অল্টম্যান-সমর্থিত দুই স্টার্টআপে তাঁর শেয়ার আছে এবং অল্টম্যানের পারিবারিক তহবিলের ১ শতাংশ শেয়ারও তাঁর নামে।
এই মামলার প্রমাণপত্রে ২০১৭ সালের একটি ডায়েরির অংশ রয়েছে। সেখানে ব্রকম্যান লিখেছিলেন, ‘আর্থিকভাবে, কোনটি আমাকে ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছে দিতে পারে?’
২০১৯ সালের আগে ওপেনএআই অলাভজনক সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হয়। কিন্তু ওই বছর মার্চ থেকে এটি অলাভজনক সংস্থার মুনাফাসন্ধানী ইউনিট হিসেবে পুনর্গঠিত হয়।
তারপর থেকে কোম্পানি গবেষক নিয়োগ, কম্পিউটিং শক্তি কেনা এবং বিস্তারের জন্য ১০ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। এ বছর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানির শেয়ারের মূল্য প্রায় এক লাখ কোটি ডলারে পৌঁছে যাবে।
ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ বলেছে, মাস্কের ক্ষোভের কারণ কোম্পানির সাফল্যের আগেই তিনি বোর্ড ছেড়ে গিয়েছিলেন। এখন তিনি আবার নিয়ন্ত্রণ নিতে চান।
এছাড়া মাস্ক তাঁর নিজের এআই কোম্পানি এক্সএআইকে শক্তিশালী করতেও এই মামলা করতে পারেন। এক্সএআই এ বছর ফেব্রুয়ারিতে স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত হয়েছে। স্পেসএক্সও এ বছর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে এবং তাদের আইপিও ওপেনএআইয়ের চেয়ে বড় হতে পারে।






