ইসলাম প্রচারের সময় নমনীয়তা ও উদারতা দেখাতে গিয়ে প্রায়ই একটি আয়াত উল্লেখ করা হয়। এতে আল্লাহ–তাআলা মুসা ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “তোমরা উভয়ে ফেরাউনের কাছে যাও, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। অতঃপর তোমরা তার সঙ্গে নরম কথা বলো, হয়তো সে শিক্ষা গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।” (সুরা ত–হা, আয়াত: ৪৩-৪৪)

কোরআন ও সুন্নাহ দাওয়াত ও সংলাপে কোমলতাকে মূল নীতি হিসেবে ঠিক করেছে। আল্লামা তাহের ইবনে আশুর বলেন, “কোমলতা হলো সত্যের দিকে ডাকার ভূষণ।” (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ১৬/২২৫)

মুসা (আ.)-এর কোমলতার উদাহরণ হলো, “তুমি কি পবিত্র হতে চাও? আমি তোমাকে তোমার প্রতিপালকের পথ দেখাব, যাতে তুমি তাঁকে ভয় কর।” (সুরা নাজিআত, আয়াত: ১৮-১৯)

তবে ফেরাউনের মতো প্রতাপশালী ও খোদাদ্রোহী জালিমের সঙ্গে এই ‘কোমল বাক্য’-এর সীমা ও ধরন কী ছিল?

বাক্যের কোমলতা মানে সত্যের ব্যাপারে আপস, হীনম্মন্যতা বা সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া নয়। শব্দের নমনীয়তা এবং বিষয়বস্তুর দৃঢ়তার মধ্যে পার্থক্য বোঝা উচিত।
মুফাসসিরদের মতে, ফেরাউনের মতো একগুঁয়ে ব্যক্তির জন্য ‘নরম কথা’ বলা ছিল মনস্তাত্ত্বিক প্রবেশদ্বার, যাতে সে প্রথমে বিমুখ না হয়ে সত্য শোনার সুযোগ পায়।

ইমাম তাবারি ও কুরতুবির মতে, এর একটি অর্থ ফেরাউনকে তার উপনাম বা সম্মানের সঙ্গে সম্বোধন করা। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এর অর্থ হলো, কথাবার্তায় রূঢ়তা বা গালমন্দ না করা। এখানে লক্ষণীয়, বাক্যের কোমলতা মানে সত্যের ব্যাপারে আপস, হীনম্মন্যতা বা সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া নয়। শব্দের নমনীয়তা এবং বিষয়বস্তুর দৃঢ়তার মধ্যে পার্থক্য বোঝা উচিত। একজন দাঈর ভাষা মার্জিত হতে পারে, কিন্তু তার ভেতরের সত্যের ওজন এত বেশি হতে পারে যা অত্যাচারীকে কাঁপিয়ে দেয়।

কোরআন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুসা (আ.)-এর সংলাপে কোমলতার পাশাপাশি চরম স্পষ্টবাদিতাও ছিল। তিনি ফেরাউনের খোদায়ি দাবিকে মুখের ওপর খারিজ করে বললেন, “আমরা তোমার রবের পাঠানো রাসুল।” (সুরা তোয়াহা, আয়াত: ৪৭)

ফেরাউন তাঁকে ‘জাদুকর’ বা ‘মোহগ্রস্ত’ বলে উপহাস করলে তিনি স্পষ্ট বললেন, “তুমি তো ভালো করেই জানো যে এই নিদর্শনগুলো আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালকই নাজিল করেছেন মানুষের চোখ খুল দেওয়ার জন্য...।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ১০২)

ফেরাউন চরম অবাধ্যতা দেখালে তাঁর কণ্ঠস্বর কঠোর হয়ে উঠল। তিনি বললেন, “আর হে ফেরাউন, আমার ধারণা যে, তুমি অবশ্যই ধ্বংস হবে।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ১০২)

তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো আল্লাহর জন্য সাক্ষী হিসেবে; যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।
সুরা নিসা, আয়াত: ১৩৫
এখানে ‘ধ্বংস’ বোঝাতে ‘মাছবূরা’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে, যার অর্থ ইবনে আব্বাসের মতে ‘অভিশপ্ত’, আর মুজাহিদের মতে ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’। ফেরাউনের সামনে তার ধ্বংস ঘোষণা করা তেজস্বিতার পরিচয়। এতে প্রমাণ হয়, হঠকারিতার মুখে সত্যের কঠোরতা ‘কোমল বাক্য’-এর নির্দেশের পরিপন্থী নয়।

ইসলামি দাওয়াতে কোরআনের মূলনীতি কোমলতা। ফেরাউনের মতো অবাধ্যকে বোঝাতে আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা তার সাথে নরম কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।” (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৪৪)

সত্য প্রচারের সাধারণ পদ্ধতি সুন্দর ও আকর্ষণীয়। আল্লাহ বলেছেন, “তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে দাওয়াত দাও হেকমত (প্রজ্ঞা) ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে...।” (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৫)

ভুল ধরাতে কোমল হতে হয় যেন লজ্জিত না হয়। নবীজি (সা.)-এর আচরণ নিয়ে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি রুক্ষভাষী ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

সত্য বলায় কঠোরতা চারিত্রিক রুক্ষতা নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন অবস্থান। প্রথমত, সত্য গোপনে অধিকার নষ্টের ভয় থাকলে নিজের বা আপনজনের বিরুদ্ধে গেলেও কঠোর হতে হয়। আল্লাহ বলেছেন, “...তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো আল্লাহর জন্য সাক্ষী হিসেবে; যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৩৫)

দ্বিতীয়ত, আল্লাহর বিধান অবমাননা বা জুলুমে সত্য প্রকাশে দ্বিধা নেই। কোরআন পাপিষ্ঠ ও জালিমদের কাজের কঠোর নিন্দা করেছে। তৃতীয়ত, সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে গোপন না করা। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪২)

আজকের যুগে দাওয়াতের নামে অনেক সময় ‘কোমলতা’ শব্দটিকে হীনম্মন্যতা বা সত্য গোপন করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

মুসা (আ.)-এর দাওয়াত থেকে ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি শেখা যায়। তিনি শুরুতে কোমলতা, মার্জিত ভাষা ও সুন্দর সম্বোধন করেছেন। তারপর সত্যের স্পষ্টতা—প্রভুত্বের দাবিতে আপস ছাড়া। শেষে তীব্র সতর্কবাণী। প্রতিপক্ষ সত্য জেনেও হঠকারিতা করলে তার ভয়াবহ পরিণতি কঠোরভাবে জানানো হয়। আজকের যুগে ‘কোমলতা’কে হীনম্মন্যতা বা সত্য গোপনের অজুহাত করা হয়। কিন্তু মুসা (আ.)-এর সুন্নাহ শেখায়, শব্দের মোড়ক নমনীয় হবে, কিন্তু ভেতরের হকের বাণী শক্তিশালী ও আপসহীন।