দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তেহরান ও ওয়াশিংটন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং হরমুজ প্রণালী চালু থাকবে। এরপর দুই দেশের প্রতিনিধিরা চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় বসবেন।
যুদ্ধবিরতির এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে। বিষয়টি জানা এক সূত্র গতকাল বুধবার রয়টার্সকে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে অ্যাক্সিওসও সূত্রের ভিত্তিতে একই তথ্য প্রকাশ করে। তারা এক পাতার সেই স্মারকের ১৪ দফার কিছু অংশও বাতলে দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু এই যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত আগেই মিলছিল। অ্যাক্সিওসের খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছিলেন, আলোচনায় অগ্রগতির কারণে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযান স্থগিত করছেন তিনি। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
সমঝোতা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের জন্য এটি স্বস্তির খবর হবে। গতকাল এই সম্ভাবনার খবরেই জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে। যুদ্ধের জেরে দাম দ্বিগুণ বেড়ে ১২০ ডলার ছাড়িয়েছিল। এছাড়া যুদ্ধে ছয় হাজারের বেশি প্রাণহানি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারক নিয়ে কিছু না বললেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ওয়াশিংটনের প্রস্তাব পর্যালোচনা চলছে। দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত। তবে জবাব এখনো দেওয়া হয়নি। তাসনিম নিউজ সূত্রের ভিত্তিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে অগ্রহণযোগ্য বিষয় রয়েছে।
আলোচনার অগ্রগতিতে আশাবাদী সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আবাস আসলানি। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘তিনি আশা করছেন গতকালের ঘটনাগুলো ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তির দিকে অগ্রগতির পথ তৈরি করেছে।’ কয়েক দিনের মধ্যে ইরান জবাব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে তারা তেহরান ও ওয়াশিংটনকে এক টেবিলে বসিয়েছিল, তবে ইতিবাচক ফল হয়নি। পরে পর্দার আড়ালে বার্তা আদান-প্রদান চলছিল। গতকাল পাকিস্তানি সূত্র রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা এটি খুব তাড়াতাড়ি শেষ করব। আমরা কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছি।’ অ্যাক্সিওস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্বাস করে স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি সম্ভব। ৪৮ ঘণ্টায় ইরানের জবাবের অপেক্ষায় তারা।
স্মারকের খসড়া নিয়ে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরান প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। স্মারক স্বাক্ষর হলে ৩০ দিনের আলোচনায় চূড়ান্ত চুক্তি হবে। এটি ইসলামাবাদ বা জেনেভায় হতে পারে। খসড়া অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে ইরান হরমুজের বিধিনিষেধ তুলবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরান বন্দরের অবরোধ সরাবে। ব্যত্যয় হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা করতে পারবে। ট্রাম্প গতকাল ট্রুথ সোশ্যালে বলেছেন, হরমুজ চালুর চুক্তিতে ইরান রাজি না হলে ‘আরও বড় পরিসরে ও তীব্রতার’ সঙ্গে হামলা চালানো হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে যুদ্ধের মূল কারণ দেখিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা পরমাণু অস্ত্রের কাছাকাছি। পশ্চিমা দেশগুলো বলে, ইরান এটি অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করতে চায়। তেহরান অস্বীকার করে। অ্যাক্সিওস জানায়, খসড়ায় চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত ও পরমাণু অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে ২০০০ কোটি ডলার ফেরত দেওয়া হবে।
সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের সময় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অ্যাক্সিওস বলছে, ১২ বা ১৫ বছর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ২০ বছর, ইরান চায় ৫ বছর। সময় শেষে ইরান ৩.৬৭ মাত্রায় সমৃদ্ধ করতে পারবে। ২০১৫-এ পরমাণু চুক্তি হয়েছিল, ২০১৯-এ ট্রাম্প ছাড়েন। যুক্তরাজ্যের এমআই-৬-এর সাবেক প্রধান জন সয়ার্স বিবিসিকে বলেন, ‘কিন্তু পরমাণু কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধান এক বা দুই দিনের আলোচনায় হবে না। ২০১৫ সালের চুক্তির সময় প্রায় দুই বছর ধরে আলোচনা চলেছিল।’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত। ছয় সপ্তাহ পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি হয়। ২২ এপ্রিল ট্রাম্প এর মেয়াদ অনির্দিষ্ট করেন। গতকাল মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এপিক ফিউরি সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ পর্ব শেষ হয়েছে।’
ইসরায়েল কিন্তু থামছে না। ৮ এপ্রিল থেকে ইরানে হামলা বন্ধ রাখলেও লেবাননে চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল টায়ার, খিরবেত সেলমসহ দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক হামলায় কয়েকজন নিহত। লেবাননে এখন পর্যন্ত ২৭০০-এর বেশি নিহত। ইসরায়েলি জরিপে ৬২ শতাংশ চায় ইরানে পূর্ণ যুদ্ধ ফিরে আসুক। সেনাপ্রধান ইয়াল জামির গতকাল বলেছেন, ‘ইরানে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর আরও একটি তালিকা আমরা প্রস্তুত করেছি। আমরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছি, যেন ইরানে আবার একটি শক্তিশালী ও বিস্তৃত অভিযান শুরু করা যায়।’
ইরানের হাতিয়ার হরমুজ প্রণালী। যুদ্ধ শুরুতে তারা এটি বন্ধ করে, যা তেলের দাম বাড়ায়। ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরান বন্দর অবরুদ্ধ করে। গত সোমবার ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণা করেন। যুদ্ধ পর হরমুজে ২৬টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে। প্রজেক্ট স্থগিতের পর ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর বলেছে, হরমুজ নিরাপদ রাখা হবে।
হরমুজ চালু হলেও যুদ্ধের আগের মতো দিনে ১৪০টি জাহাজ পাড়ি দেওয়া কঠিন হবে। যুক্তরাজ্যের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল সাইমন মেয়ল আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান এখন কারা নিয়ন্ত্রণ করছেন তা নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পথবদলের ইতিহাস রয়েছে। তাই স্মারক সই করলেও জাহাজগুলো সতর্ক থাকবে এবং ধাপে ধাপে আস্থা গড়তে হবে।






