যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই ব্যবহার করতে না পারে। অন্যদিকে ইরানের এখন অর্থের তীব্র প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে চুক্তি হলে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান ঘটবে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতার দরকষাকষি চলছে। এই আলোচনায় ইরানের ইউরেনিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ ২ হাজার কোটি ডলার ফেরত দেবে। এমন চুক্তি হচ্ছে বলে দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এপ্রিলের শুরু থেকে বিরতি চলছে। তারপর নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলতি সপ্তাহে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যদিও কিছু বিষয়ে বড় মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। চুক্তি হলে যুদ্ধ শেষ হবে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, চূড়ান্ত আলোচনার জন্য চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসতে পারেন।

একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী রোববার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এই বৈঠক হতে পারে। মিসর ও তুরস্কের সমর্থনে পাকিস্তান আলোচনার মধ্যস্থতা করছে। গত ১১ এপ্রিল প্রথম দফার আলোচনা ইসলামাবাদেই হয়েছিল। এরপর পাকিস্তানের উদ্যোগ থাকলেও দ্বিতীয় দফা আর হয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ন্ত্রণ করা। ওয়াশিংটন চায়, মাটির নিচে থাকা প্রায় ২ হাজার কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান ব্যবহার করতে না পারে। বিশেষ করে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম নিয়ে তাদের উদ্বেগ বেশি। অন্যদিকে ইরানের অর্থের খুব প্রয়োজন।

ইউরেনিয়ামের মজুত এবং জব্দ অর্থের পরিমাণ নিয়ে দুই পক্ষের দরকষাকষি চলছে। ইরান ওই অর্থ কোন খাতে খরচ করতে পারবে, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এক্সিওসে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ লিখেছেন, ‘কোনো অর্থ লেনদেন হবে না।’ তবে তিনি সরাসরি ইরানের অর্থছাড়ের বিষয় উল্লেখ করেননি।

সূত্র জানায়, আলোচনার শুরুতে খাদ্য ও ওষুধ কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৬০০ কোটি ডলার ছাড় দিতে রাজি ছিল। কিন্তু ইরান ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার দাবি করে। এখন ২ হাজার কোটি ডলার নিয়ে আলোচনা চলছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব। তবে আরেক কর্মকর্তা বলেন, ইউরেনিয়ামের বদলে ডলার ফেরত দেওয়া ‘অনেকগুলো আলোচনার একটি’ মাত্র।

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান দুই হাজার কোটি ডলারের বেশি অর্থ চায়। তারা নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই মুক্তবাজারের দরে তেল বিক্রি করতে চায়। তবে তারা একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি এবং হামাসের মতো সন্ত্রাসীদের অর্থায়নও চালিয়ে যেতে চায়। আমরা যা কিছু দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছি, সেগুলো পাওয়ার বিনিময়েও তারা এই কর্মকাণ্ড পুরোপুরি ছাড়তে রাজি নয়।’

ওয়াশিংটন চাইছিল ইরান সব পারমাণবিক উপাদান যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিক। কিন্তু ইরান তাতে রাজি নয়। তারা শুধু নিজ দেশে সেগুলোর মান কমাতে রাজি।

এখন একটি আপস-প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আওতায় উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ তৃতীয় দেশে পাঠানো হতে পারে। বাকি অংশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে ইরানে রেখে মান কমানো হবে।

খসড়া সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখার বিষয় রয়েছে। প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছিল। তখন ইরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দেয়। মধ্যস্থতাকারীরা এখন এই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছেন।

এই সমঝোতায় চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির জন্য ইরান পারমাণবিক গবেষণা চুল্লি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। তবে তাদের সব পারমাণবিক স্থাপনা মাটির ওপরে থাকতে হবে। মাটির নিচের বর্তমান স্থাপনাগুলো অকেজো করা হবে।

আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরান নমনীয় হয়েছে, তবে তা যথেষ্ট নয়। তারা আর কতটুকু এগোয়, তা দেখার বিষয়।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি চলমান আলোচনাকে ‘ফলপ্রসূ’ বলছেন। তবে তিনি সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, অজ্ঞাতনামা সূত্রগুলো দাবি করছে তারা সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে জানে। অথচ তারা কী নিয়ে কথা বলছে, সেটি নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।

তবে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ফক্স নিউজকে বলেন, ট্রাম্প সরাসরি ইরানিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সম্প্রতি এক ফোনালাপে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ দরকষাকষিও হয়।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়েছে। তারা জানিয়েছে, সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দেবে। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি। চুক্তি না হলে আবার যুদ্ধ শুরু হবে।’

আগামী শুক্রবার তুরস্কে একটি কূটনৈতিক সম্মেলনের ফাঁকে পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরে মধ্যস্থতার কাজ এগিয়ে নেওয়াই এই বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য।