আমার একটা পাহাড় ছিল! সেই ছোটবেলায় এক জুজু বুড়ি ঠাকুমা ঝোলা কাঁধে তার আগমনী গান শুনিয়ে আমায় বলেছিল, ‘ও মেয়ে তোমার কিছু চাই?’ সেদিন ওই জুজু ঠাকুমার কাছ থেকে অনেক দামে আমি ওই পাহাড় কিনেছিলাম!

পাহাড়ের নাম রেখেছিলাম অনন্ত, আর পাহাড় আমার নাম দিয়েছিল মৌ! পাহাড় আর আমি খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। অনন্ত শুধু আমার ছিল। আমি অনন্ত সম্পর্কে কখনো কারও সঙ্গে শেয়ার করতাম না। ও শুধু আমার, একান্ত আমার! যদি কেউ অনন্তের কাছাকাছি আসত, আমি খুব হিংসা করতাম। আমি ভীষণ হিংসুটে ছিলাম বিশেষ করে অনন্তর ব্যাপারে!

আমি আর ও সব সময় একসঙ্গে থাকতাম। আমার জীবনের সবচেয়ে ভালোলাগাটা ছিল পাহাড়, তাই জুজু বুড়িমার কাছ থেকে কিনেছিলাম। আমি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দোলনায় বসে পাহাড়ের সঙ্গে গল্প করতাম। শুভ্র বাতাস এসে আমার এলোকেশী চুল উড়িয়ে দিত, তা দেখে পাহাড় হেসে বলত, ‘তুই কি কখনো চুল বাঁধবি না?’ মজা করে পাহাড়কে বলতাম, ‘চুল বাঁধলে কী করে তুই আমার আলতো চুলের মিষ্টি ঘ্রাণ নিবি?’ পাহাড় তখন আমায় বলত, ‘তোর চুলে যখন আমি হাত বুলাই, তখন সবটুকু গন্ধ–স্বাদ আমি আমার মনের ভেতরে নিয়ে অন্তরের অন্তস্তলে জমা রাখি। কী করে তুই আমাকে ফাঁকি দিবি!’

আমার কেনা সেই পাহাড়ের ঢালে যখন ফুলের কলিরা একটু মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করত, ফুল ফোটার অপেক্ষায় পাহাড় আমার কানের কানে বলত, ‘মৌ কাল বিকেলে আসিস, ফুলের গন্ধ নেব আমি–তুই একান্তে বসে!

বিকেল হলেই সবাই যখন ঘুমের রাজ‍্যে পাড়ি জমাত, মানে দুপুরের খাওয়ার পর ন‍্যাপ নিত, ঠিক তখনই মা–বাবার চোখ এড়িয়ে গলির ধারের পুল পেরিয়ে রাস্তা থেকে অনেক দূরে চলে আসতাম আমার পাহাড়ের কোলে! সে যে মজা হতো, এক অস্থির ভালোলাগা কাজ করত। আমরা ফুলেদের সঙ্গে কথা বলতাম, ফুলের সুবাস মাখতাম আমাদের‍ সারা অঙ্গে! প্রজাপতি, মৌমাছি আর ভোমরার পেছন পেছন দৌড়াতাম! ওরা যখনই ফুল থেকে মধু আর বিষ নিতে শুরু করত, তখন ওদের উড়িয়ে দিয়ে ফুল থেকে আমরা মধু চুরি করতাম! খাঁটি সুস্বাদু মধু পান করতাম দুজনে! প্রজাপতি, মৌমাছি আর ভোমরা কত দিন যে আমাদের সঙ্গে আড়ি দিয়েছে, কিন্তু আমরা উপেক্ষা করতাম। প্রজাপতি, মৌমাছি আর ভোমরাকে কে পাত্তা দেয় বলুন!

আমার পাহাড় থেকে সমুদ্র দেখা যেত! আমরা দুজনেই সমুদ্রের গর্জন খুব পছন্দ করতাম!

জানেন, আমি ছিলাম রাজকন্যা! আমার বাবার রাজ‍্য আমি পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে একনিমেষে ঘুরে আসতাম। এটা এমন এক স্বপ্নের রাজ‍্য, যেখানে সাপ আর ভ্রমর একসঙ্গে খেলা করত, মহা আকাশে মেঘবালিকার সঙ্গে মেঘেরা সখ্য করত! চলে যেতাম পাতালপুরীতে, যেখানে রাক্ষস রাজপুত্রকে জাদুর কাঠি দিয়ে ঘুম পাড়ত!

হঠাৎ একদিন রাজ‍্য আর রাজকন‍্যার মায়া ছেড়ে বাবা আমার চলে গেলেন স্বর্গরাজ‍্যে! আমি রাজকুমারী থেকে হয়ে গেলাম ঘুঁটে কুড়ানি! এখন প্রতিদিন যখন সন্ধ্যা তারারা ওঠে, বুঝবেন ওই আমার রাজা আমার বাবা!

জানেন, আমি ভীষণ বড়লোক ছিলাম! আমার বিশাল অট্টালিকা ছিল, সেটা শুধুই আমার! আমি আর অনন্ত মিলে সাগরের বালু দিয়ে বিশাল অট্টালিকা তৈরি করতাম! অট্টালিকায় দাপিয়ে বেড়াত সৈন্য–সামন্ত, রাজা–উজির...আমি সব কন্ট্রোল করতাম দক্ষ হাতে! আমার সেই অট্টালিকা শেষ করে দিয়েছে সর্বনাশা জোয়ারের ঢেউ! তাতে কি, আমি মনে মনে ভাবতাম আমি অট্টালিকার মালিক!

আমি অনেক ধনী ছিলাম। আমার নিজস্ব অনেক উড়োজাহাজ ছিল! প্রতিদিন বিকেলে আমি কাগজ দিয়ে উড়োজাহাজ তৈরি করে নীল আকাশে ওড়তাম। জানেন, হঠাৎ ঝুম বৃষ্টিতে আমার সব প্লেন নষ্ট হয়ে যেত! তাতে কি, আমি কাগজের প্লেনে করে আমি আর অনন্ত কত দেশ ভ্রমণ করেছি! জানেন, আমার এই প্লেন মেঘবালিকা হিংসা করে ঝুম বৃষ্টি দিয়ে ভিজিয়ে দিত! মেঘবালিকা আমার প্লেনকে দুমড়েমুচড়ে ভিজিয়ে ফেলে দিত ওই পাহাড়ের নিচে খোলা মাঠে! আমি দৌড়ে গিয়ে হাতে নেওয়ার আগেই প্লেন তার জীবনের সমাপ্তি ঘটাত! তাতে কি, আমার প্লেনে বেড়ানোর সেই মুহূর্ত তো আর কেউ নিতে পারেনি, তাই না?

আমি অভিমান করেছি মেঘবালিকার সঙ্গে। আমার কাজলকালো চোখে জল গড়িয়ে মাটিতে পড়ার আগেই পাহাড় (অনন্ত) তার দুই হাত বাড়িয়ে আমার সোনার অশ্রু ধরে নিত। দেখুন, আমি বড়লোক, ঠিক বড়লোকই থাকতাম!

আমি নামীদামি ব‍্যবসায়ী ছিলাম! আমার পাহাড়ে এসে বসে যারা নারকেল খেয়ে নারকেলের মালা ফেলে যেত, আমি সযত্নে সেগুলো তুলে দাঁড়িপাল্লা বানাতাম! কোটি কোটি টাকায় বিক্রি করতাম আমার ব‍্যবসার মালামাল! বিক্রি করতে করতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতো, বন্ধুরা সব ঘরে ফিরত আর মা এসে হাত থেকে সেই দাঁড়িপাল্লা কেড়ে নিয়ে দূরে জঙ্গলে ফেলে দিত! বলত, ‘সন্ধ্যা নামে পটে। পশু–পাখিরা পর্যন্ত ঘরে ফিরেছে, আর তোমার বাড়ি ফেরার কোনো ইচ্ছে নেই দেখছি। পড়াশোনায় মন নেই, শুধু খেলা আর খেলা!’ তাতে কি, মায়ের বকুলি খেয়ে আমার উল্লাস আরও বেড়ে যেত। পরদিন বিকেলে আবার বন্ধুদের সঙ্গে আমার ব‍্যবসা নিয়ে মালিক সেজে বসে থাকতাম। আমি বড়লোক, মস্ত ব‍্যবসায়ীই থাকতাম!

আমি ডাক্তার আর বিজ্ঞানীও ছিলাম! আমার পাহাড়ের পাদদেশে এক ফার্মেসি ছিল! সেখান থেকে ফেলে দেওয়া ইনজেকশনের সিরিঞ্জ কুড়িয়ে ডাক্তারের ভূমিকা পালন করতাম। আমার বন্ধুদের চিকিৎসা করাতাম! আমি বড় ডাক্তার ছিলাম! যেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড়ি হতো, কেউ আমাকে খেলায় নিত না। সেদিন আমি বিজ্ঞানী হয়ে পাহাড়ের গায়ের গাছেদের শাখা–প্রশাখায় ইনজেকশন পুশ করে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করতাম! চিন্তা করতাম, কোন কঠোর মনের কাঠ ব‍্যবসায়ী এসে আমার পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই গাছেদের কেটে নিয়ে বিক্রি করে দেবে! একা একা যখন জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে গাছ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করতাম, তখন বাবা বুঝতে পারত, সবার সঙ্গে আমার আড়ি হয়েছে। তাই বাবা আমাকে এসে তার সাইকেলটি দিয়ে বলত, ‘তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস তোর মা জানার আগেই!’ আমি ছোট থেকেই সাইকেল চালাতে, মানুষের ধাক্কা মারতে ভালোবাসতাম। ওই আরকি, একটু দুষ্ট ছিলাম। বাবা আমাকে জিজ্ঞাসা করত, ‘কী রে বিজ্ঞানী, তোর আবিষ্কারের রেজাল্ট কবে বের হবে? কবে সাধারণ মানুষ আমার সোনা মেয়ের বৈজ্ঞানিক রেজাল্ট নিয়ে কাজ করতে পারবে?’ তখন মনে করতাম, সত্যিই আমি বিজ্ঞানী! আমার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আমি করতে পারব! তখন আমি কতই না বোকা ছিলাম! তাতে কি, আমি মস্ত বড় বিজ্ঞানী তো ছিলাম!

এরই মাঝে হঠাৎ পাহাড় একদিন আমাকে ডেকে পাঠায়। বলল, ‘আমি খুব ক্লান্ত, অনেক কষ্টে আছি। আমার ঢালের সব সবুজ ফ‍্যাকাশে হয়ে গেছে! শাখা–প্রশাখাগুলো প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে সেই প্রাণবন্ততা আর দেখি না! পাখিরা আর আসে না, বাসা বাঁধে না আমার গায়ে! কেউ গন্ধ মাখে না ফুলেদের কাছে! মৌমাছি, প্রজাপতি, ভোমরা—কেউ মধু সংগ্রহ করে না!’ আমি দৌড়ে গিয়ে পাহাড়কে সান্ত্বনা দিয়ে বলতাম, ‘অপেক্ষা করো। আবার ফলে–ফুলে ভরে উঠবে তুমি!’ পাহাড় বলত, ‘মৌ, তুমি তো আমারই আছ, আর কিছু চাই না আমার!’

আমার শৈশব শেষ হলো! আমি এখন গরিব। আমার অট্টালিকা নেই, উড়োজাহাজ নেই, নেই দাঁড়িপাল্লা নেই, আমি এখন ডাক্তার বা বাবার সেই বিজ্ঞানীও নই! আমি শুধুই সংসারী একজন নারী! শুধু অফিসে, ঘরে–বাহিরে কাজের মেয়ে, বাচ্চা লালন–পালনের মেশিনমাত্র! সংসারের সবার অর্ডার পালনের নীরব বস্তু, নীরবে–নিভৃতে বসে রান্নার হাঁড়ি ঠেলার যন্ত্র!

জানেন, আমার সেই কেনা পাহাড় (অনন্ত) এখন শুধু আমার নয়! অনন্ত এখন সবার টাকা জোগান দেওয়ার মেশিন! চুন থেকে পান খসলেই অনন্ত এখন আর কারও কাছেই ভালো নয়! আমার অনন্ত এখন পরিশ্রান্ত এক পুরুষ, যার শখ–আহ্লাদ করতে মানা, নীরবে–নিভৃতে ঘুমানো মানা, মৌর সঙ্গে একা একা ঘুরতে মানা। সবার চাহিদা মিটলে অবশিষ্ট কিছু থাকলে সেটা পাবে মৌ। কারণ, সে ঘরের বউ! মৌর আর কোনো দরকার নেই পাহাড়ের!

চলুন না, সবাই মিলে মৌদের শৈশবটাকে মেরে না ফেলে বাঁচিয়ে রাখি ছোট্টবেলার সেই আত্মবিশ্বাসী, সেই বড়লোক তেজি মৌদের!

*কলমে: নাজনীন আখতার পেস্তা, ভার্জিনিয়া, ইউএসএ