মানব সভ্যতায় দিনপঞ্জি আবিষ্কারের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর রীতি চালু হয়েছে। প্রথমদিকে কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠায় চাষাবাদের ফলনকেন্দ্রিক উৎসব-আচার পালন করা হতো। এগুলো ছিল চাঁদের অবস্থান ও ঋতুকেন্দ্রিক।
পরে চাঁদের অবস্থানের ভিত্তিতে দিনপঞ্জি তৈরি হয়। এরপর সৌর ও চন্দ্রের অবস্থান মিশিয়ে পঞ্জিকা গড়ে ওঠে। এভাবেই বিশ্বজুড়ে নববর্ষ উৎসব পালনের সূচনা ঘটে।
আজ বিশ্বব্যাপী নানা সংস্কৃতি ও পঞ্জিকা থাকলেও নববর্ষের মূল উৎস কৃষিকেন্দ্রিক। শস্য উৎপাদনের নির্দিষ্ট মৌসুম থেকে বছর শুরু নির্ধারিত হয়েছে, যা আজও সর্বত্র প্রচলিত।
অর্থাৎ শস্য ঘরে তোলার উপলক্ষে অন্নপার্বণ প্রবর্তনই নববর্ষের উৎস বলে বিবেচিত।
নববর্ষ উৎসবের প্রাচীনতম নথি পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। মেসোপটেমিয়ায় ব্যাবিলনে আকিতু নামে নববর্ষ শুরু হতো বসন্তকালের অমাবস্যায়। মিশরীয় ও ফিনিশীয়দের বছর শুরু হতো শরৎকালে। গ্রিকরা শীতকালে নববর্ষ পালন করত।
রোমান বর্ষপঞ্জিতে বছর শুরু হতো পয়লা মার্চ, কিন্তু ১৫৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের পর এটি পরিবর্তিত হয় পয়লা জানুয়ারিতে। জুলিয়ান পঞ্জিকায়ও এটি প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে পৃথিবীজুড়ে নববর্ষ বিভিন্ন সময়ে পালিত হয়।
বাংলায় নববর্ষের ঐতিহ্য যতটা প্রাচীন না হলেও ইতিহাস বলে ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে রাজা শশাঙ্ক সূর্যের অবস্থান নির্ধারণ করে পয়লা বৈশাখ পালন শুরু করেন। পরে মুঘল সম্রাট আকবর এই রীতিকে জনপ্রিয় করেন।
আকবরকে এতে সাহায্য করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ শিরাজি।
বাংলা নববর্ষে সনাতনী সংস্কৃতিতে গণেশ পুজোর চল প্রাচীন যুগ থেকেই চলে আসছে। যেহেতু নতুন বছরের সমস্ত কাজকর্মে সিদ্ধিলাভের আকাঙ্ক্ষা বিরাজমান, তাই সিদ্ধিদাতা গণেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক বজায় রাখাটাও সহজ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, চন্দ্রমতে তৈরি হিজরি পঞ্জিকায় কৃষিফসল ঘরে তোলার হিসাব রাখা কঠিন হয়। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে আকবর চন্দ্র-সৌর গণনার মিশ্রণে নতুন পঞ্জিকা প্রবর্তন করেন।
সেই পঞ্জিকার নাম ‘ফসলি সন’ বা ‘তারিখ-ই-ইলাহি’। পরে এটি বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। আগে খাজনা হিজরি সনের প্রথম দিনে আদায় হতো।
নতুন হিসাবের খাতা বা হালখাতা শুরু হতো সেইদিন থেকে। এটিকে পুণ্যাহ বা পুণ্যদিনও বলা হতো। চন্দ্র পঞ্জির গরমিলের কারণে পরে বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখে নতুন খাতা খোলা চালু হয়। পরবর্তী চারশো বছর এটি চলে।
তবে বাংলা নববর্ষে হালখাতার পাশাপাশি সনাতনী সংস্কৃতিতে গণেশ পুজো প্রাচীন যুগ থেকে চলে আসছে। হালখাতায় নতুন বছরের কাজকর্মে সিদ্ধির আকাঙ্ক্ষা থাকায় সিদ্ধিদাতা গণেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন সহজ হয়েছে।
যদিও নববর্ষ কোনো ধর্মভিত্তিক উৎসব নয়। এটি প্রকৃত অর্থে দলমতধর্ম নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসব।
যেসব ফুল গত বৈশাখে ফুটেছিল আজ আবার সেই চাঁপা-বেল-জুঁই, নূতন ঋতুতে নব আনন্দের সরসতায় আবির্ভূত হল। তাদের ক্লান্তি নেই, অবসাদ হয় না।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে নববর্ষের আধুনিক রূপে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলার প্রত্যেক উৎসবকে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক রূপ দিয়েছেন।
এই উৎসবগুলোকে তিনি চিরসত্যের মধ্যে চিরনূতনের রূপে দেখতে চেয়েছেন।
‘নববর্ষ’ প্রবন্ধে শান্তিনিকেতন পত্রিকার ১৩২৯ সনের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় তিনি লিখেছেন, ‘আজ আমাদের নববর্ষের উৎসবের দিন। যিনি চিরনবীন তিনি গ্রহতারালোকিত মহারথে, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, চিরজীবনের পথে সংসারকে নিয়ত বহন করে নিয়ে চলেছেন।
আজ আমরা সেই অমৃতস্বরূপের আশীর্বাদ অন্তরে গ্রহণ করে জীবনকে মৃতসঞ্জীবনীরসে অভিষিক্ত করব। আমরা আজ বাইরের জগতের দিকে চেয়ে নূতনের উৎসবকে দেখতে পাচ্ছি। প্রকৃতিতে পুনঃ পুনঃ নূতনের আবর্তন হচ্ছে। পৃথিবী যেখান থেকে সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিণ শুরু করেছিল আজ বৎসরান্তে সেখান থেকেই আবার তার যাত্রার আরম্ভ হল।
এই আবর্তনের মধ্যে বিচ্ছেদ নেই। যেসব ফুল গত বৈশাখে ফুটেছিল আজ আবার সেই চাঁপা-বেল-জুঁই, নূতন ঋতুতে নব আনন্দের সরসতায় আবির্ভূত হল। তাদের ক্লান্তি নেই, অবসাদ হয় না, তারা বিনষ্ট হয়নি, তারা মহাপ্রাণের হৃদয়ের মধ্যে সঞ্চিত ছিল, তাই আবার ফিরে এল।
তাই আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বের ললাটে জরার বলিরেখা নেই — আজ চারিদিকে শুনতে পাচ্ছি নূতনের জয়ধ্বনি।’






