বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ পড়তে গিয়ে ছেলেবেলায় প্রথম শুনেছিলাম চড়ক ও গাজনের কথা। কারণ বাংলার সব অঞ্চলে এই উৎসব বা মেলা বসে না। সেখানে লেখা ছিল, “চড়কের আর বেশি দেরি নাই। বাড়ি বাড়ি গাজনের সন্ন্যাসীরা নাচিতে বাহির হইয়াছে। দুর্গা ও অপু আহার নিদ্রা ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাসীদের পিছনে পিছনে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরিয়া বেড়াইল।” এরপর থেকেই এই গ্রামীণ উৎসব নিয়ে কৌতূহল জেগে উঠেছিল।

বাংলা বর্ষপঞ্জির শেষ মাস চৈত্র। তখন চারদিকে প্রখর তাপদাহ নেমে আসে। চৈত্র শেষ হলে ঋতুরাজ বসন্তেরও বিদায় ঘটে এবং নতুন বছর শুরু হয়। পুরোনো বছরের শেষে, নতুন বছরে পা দেওয়ার আগে গ্রামবাংলার সনাতনী হিন্দুরা চড়ক উৎসব পালন করেন। এটিকেই গাজন উৎসবও বলা হয়। এককালে এটি গ্রামাঞ্চলের ধর্মভীরু সনাতনীদের নিজস্ব উৎসব ছিল।

সভ্যতার প্রভাবে গ্রামবাংলার মেঠো জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে, ফলে গাজন ক্রমশ বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে। তবু দুই বাংলার অনেক গ্রামে এবং শহরের কিছু অংশে ২১শ শতাব্দীতেও এই উৎসব দেখা যায়। জেলা সংবাদে এর খবর প্রকাশ পায়।

সংস্কৃত শব্দ ‘গর্জন’ থেকে প্রাকৃত শব্দ ‘গজ্জন’ এসেছে। তারপর তা বাংলায় রূপান্তরিত হয়েছে ‘গাজন’-এ।

‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ পত্রিকায় ১৩১৮ সালে হরিদাস পালিত লিখেছিলেন, “জনগণের চিৎকার, বিপুল বাদ্যোদমে গর্জন, তাই বোধহয় উৎসব কালক্রমে গাজন নামে অভিহিত হইয়া থাকিবে।” সংস্কৃত ‘গর্জন’ থেকে প্রাকৃত ‘গজ্জন’ হয়েছে, তারপর বাংলায় ‘গাজন’। অনেক নৃতাত্ত্বিকের মতে এর উৎপত্তি গ্রামের জনসাধারণের উপস্থিতি থেকে। লোকসংস্কৃতির গবেষক তারাপদ সাঁতরা বলেন, ‘গাজন’ বাংলার প্রকৃত গণ উৎসব।

সনাতনীরা বিশ্বাস করেন, শিবের জন্ম শ্রাবণ মাসে এবং চৈত্রে শিব-পার্বতীর বিবাহ হয়েছে, যা মধুমাস। তাই ঢাকের বাজনা নিয়ে ভোলানাথের নামসংকীর্তন ও গর্জন করে সন্ন্যাসীরা পথ-ঘাট-মাঠ-শ্মশান প্রদক্ষিণ করেন। তপ্তদিনের মৌন প্রান্তর তখন গাজনগীতি ও “বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে” উচ্চারণে মুখরিত হয়।

ঐতিহাসিকদের মতে, এই উৎসবে সমাজের সর্বশ্রেণীর সনাতনী অংশ নেয় না। গ্রামের প্রান্তিক কৃষক, কুমোর, কামার, জেলে, মালো, হাঁড়ি, মুচি, বাউরি, বাগদি প্রমুখ কৌমের প্রতিনিধিরাই ভোলানাথ মহেশ্বরের স্মরণে এটি পালন করেন।

গ্রামের প্রান্তিক কৃষক, কুমোর, কামার, জেলে, মালো, হাঁড়ি, মুচি, বাউরি, বাগদি প্রভৃতি কৌম সমাজের প্রতিনিধিরাই ভোলানাথ মহেশ্বরের স্মরণে এই উৎসব পালন করে থাকে।

ইতিহাসে কিংবদন্তি আছে, ১৪৮৫ সালে রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুর চড়ক পূজো প্রচলন করেন। তবে এটি ধনীদের পূজো নয়, ব্রাহ্মণদেরও প্রয়োজন পড়ে না। ১৮৩১ সালের ৩০ এপ্রিল ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, কলকাতার ধনী বাবুরা বনেদিয়ানা দেখানোর জন্য চড়ক দল পুষতেন।

চড়ক প্রস্তুত করতে গাছ ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। গোড়ায় জলভরা পাত্রে বুড়োশিব নামক শিবলিঙ্গ রাখা হয়। চার চারমুখো মাচান বেঁধে মধ্যে একজন করে মহাদেব সাজানো হয় এবং চার কোণে চারজন করে মোট ১৬ জনের পিঠ ফুঁড়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। যদিও ‘ষোলো চড়কি’ ১৮৫৫ সালে বন্ধ হয় এবং ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ সরকার আইন করে এই উপাচার বন্ধ করে।

দেশীয় পণ্ডিত হুতোম প্যাঁচা, প্রাণকৃষ্ণ দত্ত, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, রামকমল সেন, শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং ইংরেজ পণ্ডিত ফ্যানি পার্কস, এলিজা ফ্রে, জিওফ্রে ওডি, ও’ম্যালিরা গাজন-চড়ক নিয়ে লিখেছেন। চড়ক গাছে পিঠফোঁড়া ভক্তরা যে দণ্ডে ঘুরেন তা ‘গজারি’, যা শিবের নাম। ‘চড়ক’ শব্দ চক্র থেকে এসেছে, চক্রাকারে ঘোরা থেকে।

শিবের উপাসকরা চড়ক-গাজনে পিঠফোঁড়, বাণফোঁড়, চাটুফোঁড়, বঁটিঝাঁপ, কাঁটাঝাঁপ, নীলের ব্রত, আগুনে হাঁটা, সং নাচ প্রভৃতি লোকাচার পালন করেন। নারীরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীলব্রত পালন করেন, কারণ নীলকণ্ঠ মহাদেবের নাম। কোথাও গম্ভীরা গানে শিবসংকীর্তন হয়।

দীপান্বিতা দে : প্রাবন্ধিক ও শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা