রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার একটি টিকাদান কেন্দ্রে শিশুদের টিকা দিচ্ছিলেন স্বাস্থ্যকর্মী আবুল হায়েক। তাঁর উপজেলায় স্বাস্থ্য সহকারীর ৪৭টি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ১৫ জন কর্মরত। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে আবুল হায়েক বলেন, ‘জনবলসংকট থাকায় আমাদের কাজের চাপ কিছুটা বেশি। নিয়মিত দায়িত্বের বাইরেও বাড়তি কাজ করতে হয়। তবে টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে অন্য বিভাগের কর্মীরাও আমাদের সহযোগিতা করছেন। সবাই মিলে চেষ্টা করছি, যাতে কোনো শিশু টিকার বাইরে না থাকে।’ হায়েকের মতো হাজারো মাঠকর্মী বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন।
হামের প্রকোপ ও মৃত্যুঝুঁকি
এই জনবলসংকটের মধ্যেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ১৪৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ জন শিশুর মৃত্যু হামের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গত কয়েক বছর মাঠপর্যায়ে সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত টিকার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশে স্বাস্থ্য সহকারীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনবলসংকট রয়েছে, এটি আমরা জানি। এই শূন্যতা পূরণে স্বাস্থ্য বিভাগে ১ লাখ নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
খুলনা ও রংপুর বিভাগের জনবল চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে স্বাস্থ্য খাতে জনবলসংকট তীব্র। এখানে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ১ হাজার ৪১১টি পদের বিপরীতে ৪৪ শতাংশ বা ৬২০টি পদ খালি। সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৪ হাজার ২২৪টি পদের বিপরীতে ৩ হাজার ৫৫ জন কর্মরত। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারীর ২০ হাজার ৯০৯টি পদের মধ্যে ৬ হাজার ৮৮৮টি পদ শূন্য। ফলে বিদ্যমান কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ছে।
রংপুর বিভাগেও একই অবস্থা। সেখানে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ১৫৩টি পদের বিপরীতে মাত্র ১৫ জন কর্মরত। সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৪৫২টি পদের বিপরীতে ১১১ জন দায়িত্ব পালন করছেন। স্বাস্থ্য সহকারীর ২ হাজার ২২৫টি পদের বিপরীতে ১ হাজার ৩৯৩ জন কাজ করছেন।
বিভাগীয় পরিচালকদের ভাষ্য
রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘রাজশাহী বিভাগে স্বাস্থ্য সহকারী পদে বড় ধরনের সংকট রয়েছে। পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে নতুন করে জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু বাকি ছয়টি জেলা—রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাটে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়ায় কাজের চাপ অনেক বেশি।’
চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি জানান, ১১টি জেলার মধ্যে ৮টিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, বাকি তিনটি জেলায় প্রক্রিয়া চলমান। তবে সামগ্রিকভাবে পুরো বিভাগেই আরও জনবল প্রয়োজন। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল জানান, ছয়টি জেলাতেই বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য। তিনি বলেন, ‘জনবলসংকট থাকলেও আমরা প্রতিটি জেলায় নতুন নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক জানান, চার জেলার মধ্যে শুধু জামালপুরে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। ময়মনসিংহ সদর, শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলায় নতুন কোনো নিয়োগ না হওয়ায় বিদ্যমান কর্মীরা বাড়তি চাপ নিয়ে সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের বিপরীতে একজন স্বাস্থ্য সহকারী কর্মরত থাকেন। অনেক জায়গায় পদ শূন্য থাকায় পার্শ্ববর্তী এলাকার কর্মীরা দায়িত্ব পালন করেন। একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম সেরা। কিন্তু নিয়মিত নিয়োগ না হওয়ায় এখন আমাদের ওপর পাহাড়সম কাজের চাপ। তবে অন্য বিভাগের কর্মীরা এগিয়ে আসায় আমরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি।’
ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ জেলায় নতুন নিয়োগ সম্পন্ন হলেও কিছু এলাকায় শূন্য পদ রয়েছে। ফলে সারা দেশে টিকাদান সফল করতে নতুন জনবল নিয়োগ জরুরি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দেশে স্বাস্থ্য সহকারীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনবলসংকট রয়েছে, এটি আমরা জানি। এই শূন্যতা পূরণে স্বাস্থ্য বিভাগে ১ লাখ নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এই ১ লাখের মধ্যে স্বাস্থ্য সহকারীসহ টেকনিশিয়ান, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি—সব খাতের জনবলই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমরা যোগ্য ও দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে বদ্ধপরিকর।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘জনবল কম থাকলেও সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমাদের টিকাদান কর্মসূচি চলমান রয়েছে। জনবলের কারণে টিকাদান ব্যাহত হচ্ছে না। বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা একযোগে কাজ করায় সেবা সফলভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে। আমরা দ্রুত এই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা আরও বাড়াতে কাজ করছি।’
এই বৃহৎ নিয়োগ সম্পন্ন হলে তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দ্রুত জনবল যুক্ত হলে হামের মতো রোগ রোধ এবং টিকাদান লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।






