দেশের সংকটের সময় সবসময় সামনে থাকলেও শাসনব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণে তরুণদের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। তরুণদের কেবল মাঠের শক্তি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের অর্থবহ অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার এখন সময়।
গতকাল রোববার রাজধানীর সামরিক জাদুঘরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ২০০ তরুণের অংশগ্রহণে ‘ইয়ুথ কনক্লেভ ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকরা এমন মতামত জানান। সম্মেলনের আয়োজক প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও মুক্তকণ্ঠ। তরুণদের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
সকাল ও দুপুর—দুই পর্বে সম্মেলন চলে। প্রথম পর্বে প্যানেল আলোচনা হয় এবং দ্বিতীয় পর্বে অতিথিদের আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
প্রতিবছরের মতো এবারও ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ‘ইয়ুথ ইকুয়ালিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ প্রদান করে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল। এটি তাদের ‘চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ুথ লিডারশিপ’ প্রোগ্রামের আওতায় দেওয়া হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: জিনসটু টোটস, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর ডেভেলপমেন্ট, কোস্টাল এডুকেশন অ্যান্ড ডাইভার্সিটি ইম্প্রুভমেন্ট অর্গানাইজেশন, এফএফসিআরজে ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, কেপ সি (সোশ্যাল ইনক্লুশন পোর্টফোলিও) এবং নবপ্রভাত ফাউন্ডেশন।
বিজয়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মো. সাইফুজ্জামান, মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস।
পুরস্কার বিতরণের পর উপস্থিত তরুণদের উদ্দেশে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। তরুণেরাই এই দেশের পরিবর্তন আনতে পারে। তারুণ্যের এই শ্রেষ্ঠ সময় মানুষের কল্যাণে নিবেদন করতে হবে। তাহলেই দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, পুরস্কারের জন্য যে ছয় প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয়েছে, তারা সবাই প্রতিনিধিত্বমূলকভাবে নির্বাচিত। এর উদ্দেশ্য একজনকে দেখে যেন বাকিরা শিখতে পারে। পুরো ৬৪ জেলার মানুষ অনুপ্রাণিত হয়।
মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘আপনারা যে কাজ শুরু করেছেন, ছোট ছোট কাজ—সেগুলোই ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে।’ তিনি বলেন, সহজে কিছু হবে না, দ্রুত কিছু হবে না। সময় দিতে হবে, ধীরে ধীরে এগোতে হবে। ভবিষ্যতের একটা ভালো সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সরকারব্যবস্থার জন্য চেষ্টা করতে হবে।
মতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সামনে একটা নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে তরুণদের, ছাত্রদের, ছাত্রীদের, যুবকদের এবং নারীদের একটা বড় ভূমিকা আছে।...যার যার জায়গা থেকে প্রত্যেককে এ দেশের পরিবর্তনের জন্য, ভালো করার জন্য, বাংলাদেশের জয়ের জন্য সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।
এর আগে সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সূচনা হয়। এরপর শাসনব্যবস্থায় তরুণদের ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ এবং প্রতীকী উপস্থিতির বাইরে গিয়ে অর্থবহ সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে দুটি প্যানেল আলোচনা হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘আমাদের তরুণেরা কী বলছে...আমরা শুনছি না ঠিক করে বা শুনতে পারছি না। আর শুনলেও তা জায়গামতো আমরা বোঝাতে পারছি না। এটার মধ্যে বিরাট একটা গ্যাপ আছে।’ তিনি বলেন, তরুণদের ক্ষমতায়নকে শুধু প্রজেক্ট হিসেবে দেখলে হবে না। প্রজেক্টের বাইরে গিয়ে এটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে।
জনপরিসরে তরুণদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার বলে মত দেন বিআইডিজির হেড অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিটিকস সৈয়দা সেলিনা আজিজ। তিনি বলেন, এটা ছাড়া কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
অল্টারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন বলেন, রাজনীতিতে নারীদের আর অলংকার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তাদের নির্বাচন করতে দিতে হবে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দিতে হবে।
ইউএনডিপির হেড অব কমিউনিকেশন আবদুল কাইয়ুম বলেন, তরুণদের শোনার ধৈর্য কমে যাচ্ছে কি না, দেখতে হবে। তারা অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে কি না, ফলাফল দেখতে খুব তাড়াহুড়ো করছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দেশের জন্য সত্যি সত্যিই কাজ করতে চাইলে তরুণদের ধৈর্য থাকতে হবে।
ইয়ুথ ফর এনডিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আমানুল্লাহ পরাগ বলেন, তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যেকোনো প্রক্রিয়ার একদম শুরু থেকে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিতে হবে। তরুণদের কথার মূল্য দিতে হবে।
প্যানেল আলোচনায় আরও অংশ নেন দ্য ডেইলি স্টার-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম, ইয়ুথ ফর চেঞ্জ বাংলাদেশ ফোরামের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সাদিয়া আফরিন, বিওয়াইএলসির সিনিয়র ম্যানেজার হাবিবুল্লাহ তামিম। দুটি প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক (ইনফ্লুয়েন্সিং, ক্যাম্পেইন ও কমিউনিকেশন) নিশাত সুলতানা এবং উপদেষ্টা (চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ুথ লিডারশিপ) ফাল্গুনী রেজা।
সম্মেলনের শুরুতে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মাহিন নেওয়াজ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন মুক্তকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। আরও বক্তব্য দেন রাজনৈতিক কর্মী নাজিফা জান্নাত এবং এসইআরএসি-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক (ফিন্যান্স, অপারেশন ও সিস্টেমস) এ এফ এম মাইন। সম্মেলনের শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।






