আধ্যাত্মিক জগতের আকাশে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হযরত রাবেয়া বসরির জীবন কোনো নির্দিষ্ট যুগের সীমানায় বাঁধা পড়েনি। অষ্টম শতাব্দীতে বসরা শহর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইসলামী তাত্ত্বিকতায় মুখরিত ছিল, তখন এই নিভৃতচারী নারী স্রষ্টা ও সৃষ্টির চিরন্তন সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন।

শেখ ফরিদউদ্দিন আত্তার (রহ.)-এর কালজয়ী গ্রন্থ তাজকিরাতুল আউলিয়া-এ রাবেয়া বসরির জন্ম ও প্রাথমিক জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। শেখ আত্তার লিখেছেন, তিনি ছিলেন পিতামাতার চতুর্থ সন্তান, তাই নাম রাখা হয় ‘রাবেয়া’ (চতুর্থ)। তাঁর জন্মরাতে ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর তেলও ছিল না। এই চরম দারিদ্র্য এবং পরবর্তীকালে দাসত্বের জীবনে পড়েও তাঁর আধ্যাত্মিক নিমগ্নতা কমেনি। (তাজকিরাতুল আউলিয়া, ১/৬২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ২০০৩ খ্রি.)

রাবেয়া বসরির জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল ‘হুব্ব’ বা বিশুদ্ধ ভালোবাসা। তাঁর আগে অনেক সুফি সাধক স্রষ্টাকে পাওয়ার মূল পথ হিসেবে ‘খাওফ’ (ভয়) ও ‘রাজা’ (আশা)-কে প্রাধান্য দিতেন।

রাবেয়া বসরির দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল ‘হুব্ব’ বা বিশুদ্ধ ভালোবাসা। তাঁর পূর্বসূরি সুফিরা স্রষ্টালাভের পথে ‘খাওফ’ (ভয়) ও ‘রাজা’ (আশা)-কে প্রধান মনে করতেন, কিন্তু তিনি এক বৈপ্লবিক চিন্তা প্রবর্তন করেন। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করেছেন: “হে আল্লাহ, যদি আমি জাহান্নামের ভয়ে তোমার ইবাদত করি, তবে আমাকে সেই আগুনেই পুড়িয়ে দাও।” (ইয়াহইয়াউল উলুম, ৪/২১৯, দারুল মা’রিফাহ, বৈরুত: ১৯৮২ খ্রি.)

গাজ্জালির মতে, জান্নাত বা জাহান্নামের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল স্রষ্টার সত্তাগত সৌন্দর্যের জন্য তাঁকে ভালোবাসাই মহব্বতের সর্বোচ্চ স্থান। তাঁর সমকালীন বসরা ছিল তাত্ত্বিক আলোচনার কেন্দ্র। শেখ আবু তালিব মক্কি (রহ.) তাঁর গ্রন্থে রাবেয়া বসরি ও হাসান বসরির আধ্যাত্মিক কথোপকথন উল্লেখ করেছেন। যদিও বয়সের ব্যবধান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ আছে, তবু আধ্যাত্মিক ধারায় এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের মিলনকে সম্মানের চোখে দেখা হয়।

স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা আমার হৃদয়ে এতটাই পূর্ণ যে সেখানে কারও জন্য ঘৃণা পোষণ করার অবকাশ নেই।
রাবেয়া বসরি (রহ.)

জনৈক ব্যক্তি রাবেয়াকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি শয়তানকে ঘৃণা করেন কি না। তিনি উত্তর দেন, স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা তাঁর হৃদয়ে এতটাই পূর্ণ যে সেখানে কারও জন্য ঘৃণা পোষণ করার অবকাশ নেই। (কুতুল কুলুব, ৪/১৫০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৯৯৭ খ্রি.) তাঁর দর্শনে পার্থিব মোহ ত্যাগ বা ‘জুহদ’ ছিল কঠোর। ইবনুল জাওজি (রহ.) বর্ণনা করেছেন, জনৈক ব্যক্তি দুনিয়ার আরাম নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, যে দুনিয়ার মালিক সম্পর্কে জানে, সে কীভাবে দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে? ইবনুল জাওজি আরও লিখেছেন, রাবেয়া রাতের দীর্ঘক্ষণ সেজদায় কাটাতেন আল্লাহর সান্নিধ্য খুঁজে। (সিফাতুস সাফওয়াহ, ৪/৫৭, দারুল মা’রিফাহ, বৈরুত: ১৯৭৯ খ্রি.)

তাঁর নির্জনবাস (খলওয়াত) ছিল সাধনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শেখ সোহরাওয়ার্দি (রহ.) আধ্যাত্মিক পথিকদের জন্য তাঁকে অপরিহার্য আদর্শ বলে উল্লেখ করেছেন। (আওয়ারিফুল মাআরিফ, ১১৮, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত: ১৯৮৩ খ্রি.) ইবনে খাল্লিকান লিখেছেন, রাবেয়া সুফিবাদকে প্রেম ও অনুরাগের ভূমিতে নিয়ে এসেছিলেন। (ওয়াফায়াতুল আ’য়ান, ১/২৫৬, দারু সাদের, বৈরুত: ১৯৭২ খ্রি.) তাঁর দর্শনের আরেক দিক ‘রেজা’, অর্থাৎ আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি। আল-কুশায়রি (রহ.) লিখেছেন, তিনি বিশ্বাস করতেন—বিপদ হোক বা সম্পদ, সব অবস্থায় আল্লাহর ইচ্ছা মেনে নেওয়াই প্রকৃত বন্দেগি। (আর-রিসালাতুল কুশায়রিয়্যাহ, ২/৪২১, দারুল মা’আরিফ, কায়রো: ১৯৬৬ খ্রি.)

রাবেয়া বসরি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, একজন নারী তাঁর আত্মিক শক্তি দিয়ে পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারেন।

১৮৫ হিজরি (৮০১ খ্রিষ্টাব্দ) নাগাদ বসরা ত্যাগ করে চিরস্থায়ী আবাসের পথে যাত্রা করেন এই মহান নারী। তাঁর জীবন আল্লাহর সঙ্গে দীর্ঘ মোনাজাত ও খোদাপ্রেমের অদ্বিতীয় উদাহরণ।

ইফতেখারুল হক হাসনাইন : আলেম ও লেখক