৪০ দিনের যুদ্ধের পর আশার সঙ্গে শুরু হওয়া ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা হতাশায় শেষ হয়েছে। কোনো সমঝোতা না হওয়ায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখন একে অপরকে দোষ দিচ্ছে।
গতকাল শনিবার আলোচনা শুরুর পর দুই পক্ষই এটাকে ‘ইতিবাচক’ বলেছিল। কিন্তু পাকিস্তানের রাজধানীতে রাত গড়িয়ে ভোর হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ‘খারাপ খবর’ দেন। ইসলামাবাদ ত্যাগ করার আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ২১ ঘণ্টার আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়নি।
আলোচনাস্থলের হতাশা পরিবেশ বিবিসির পাকিস্তান সংবাদদাতা ক্যারি ডেভিসের বর্ণনায় স্পষ্ট। ভ্যান্সের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ডেভিস দেখেন, সম্মেলন শেষ হতেই হোটেলের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের জন্য দীর্ঘ গাড়িবহর তৈরি হয়েছে। সেখানে পাকিস্তানি নিরাপত্তা ছাড়াও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের নিজস্ব নিরাপত্তাদল ছিল।
ক্যারি ডেভিস লিখেছেন, ‘আমরা আমেরিকার পতাকাশোভিত একটি গাড়িকে দ্রুত হোটেল ছাড়তে দেখেছি। ধারণা করছিলাম, দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও কোনো চুক্তি না হওয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।’
সেখানকার হতাশার আবহ স্পষ্ট ছিল বলে তিনি জানান, ‘অনেকে আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ফারাক থাকায় শান্তিচুক্তি হওয়া কঠিন। তবে দুই পক্ষ থেকেই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসায় অনেকের আশা ছিল, সবাই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সত্যিই আন্তরিক।’
‘ফলে এই হতাশা শুধু সম্মেলনকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে,’ লিখেছেন বিবিসির এই সাংবাদিক।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনায় গোটা বিশ্বের দৃষ্টি ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের জন্য পৃথিবীর সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর যুদ্ধ শুরু হয়। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনায় আঘাত করে যুদ্ধ বিস্তার করে। এরপাশাপাশি ইরানের লেবাননে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যায় ইসরায়েল।
ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করায় বিশ্বের তেলবাজার অস্থির। বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের ২০ ভাগ এই সরু জলপথ দিয়ে হয়।
হরমুজ না খুললে ইরানের সভ্যতা বিলীন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা না পার হতেই গত মঙ্গলবার তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। এরপর ইসলামাবাদে দুই পক্ষের সরাসরি আলোচনা শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স নেতৃত্ব দেন। ইরানের পক্ষে পার্লামেন্টের স্পিকার বাগের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইসলামাবাদে পৌঁছান।
ইরান চুক্তিতে না এলে আবার হামলা হবে বলে ট্রাম্প আগেই হুমকি দিয়েছিলেন। বৈঠকে সমঝোতা না হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, আবার কি যুদ্ধ শুরু হবে?
বিবিসির বিশ্ব সংবাদদাতা জো ইনউড তাঁর তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণে বলেছেন, মূল প্রশ্ন এখন—এরপর কী হবে? উভয় পক্ষই যুদ্ধে নিজেদের বিজয়ী দাবি করে এসেছে বলে সমঝোতা কঠিন ছিল। শেষমেশ তা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ আবার শুরুর কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই বলে লিখেছেন ইনউড। তবে ইরানে হামলার সম্ভাবনা বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এই প্রতিশ্রুতি না দেওয়ায় আলোচনা ব্যর্থ। ইরান দাবি করে, তাদের এমন উচ্চাভিলাষ নেই।
ইরানের পক্ষে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক’ দাবির জন্য আলোচনা ভেস্তে গেছে। আলোচনা ব্যর্থায় হরমুজ খোলার সম্ভাবনা কমে যায়। উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধজাহাজ পৌঁছায়।
জো ইনউড লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের এই সরাসরি বৈঠক ঐতিহাসিক ছিল। কিন্তু তা কূটনীতির ব্যর্থ উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তি না হওয়ায় যুদ্ধের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ট্রাম্প আবার যুদ্ধ চাইবেন কি না তা স্পষ্ট নয়, কারণ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ইসলামাবাদে ভ্যান্স যুদ্ধের ইঙ্গিত দেননি। বরং বলেন, ইরান চাইলে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ‘চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব’ গ্রহণ করতে পারে। ভবিষ্যতে নতুন আলোচনার কথা তিনি বলেননি।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান আশা করছে, দুই পক্ষের আলোচনা চলবে। আলোচনা শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বিবৃতিতে বলেন, উভয় পক্ষের জন্যই যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ধরে রাখা অত্যাবশ্যক। আগামী দিনগুলোতে পাকিস্তান সংলাপ এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে।
ইরানও আলোচনা আবার হবে না—এটা উড়িয়ে দিচ্ছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও গুরুত্বপূর্ণ দুই-তিনটি বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
ইসমাইল বাগাইয়ের ভাষায়, ‘এ আলোচনা হয়েছে ৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর, যেখানে চারদিকে শুধু অবিশ্বাস আর সন্দেহ। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম বৈঠকেই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা আমাদের ছিল না। আর তেমনটা কেউ আশাও করেনি।’
ভবিষ্যৎ আলোচনার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কখনো শেষ হওয়ার নয়। সেটা শান্তির সময় হোক, কিংবা যুদ্ধের সময়, সময় সময়ের জন্যই।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিএনএন, তাসনিম নিউজ, ডন






