ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতায় আসতে দ্বিতীয় পর্যায়ের রণকৌশলের প্রধান দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতীয় রাজনীতির ‘চাণক্য’ অমিত শাহ। কলকাতার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী কেন্দ্র ভবানীপুরে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন, ভোটের আগে ১৫ দিন এই রাজ্যে থাকবেন এবং ১৭৫টি আসন জিতে দিল্লি ফিরবেন। পরিবর্তন এনে ছাড়বেন।
দুই বছর আগে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গে মোট ২৩টি জনসভা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রচার করা প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র সাতজন জয়ী হয়েছিলেন, ১২ জন হেরেছিলেন।
তখনো মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ‘মগজাস্ত্র’ জন্মায়নি। এবার সেই মগজাস্ত্রের আঘাতে ৯১ লাখ ভোটারের নাম উবে যাওয়ার পর মোদির ‘ম্যান ফ্রাইডে’ অমিত শাহ দায়িত্ব নিয়েছেন।
অমিত শাহ জানেন, ভোটের দিন ভোট দেওয়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আসল কারিকুরি। সেদিন যাঁর সংগঠন মসৃণভাবে চালিত হয়, জয়তিলক তাঁর কপালেই আঁকা হয়। সেই দায়িত্ব শাহ এবার নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন ১৫ দিন রাজ্যে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে।
অমিত শাহ জানেন, ভোটের দিন ভোট দেওয়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আসল কারিকুরি। সেদিন যাঁর সংগঠন মসৃণভাবে চালিত হয়, জয়তিলক তাঁর কপালেই আঁকা হয়। সেই দায়িত্ব শাহ এবার নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন ১৫ দিন রাজ্যে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে।
রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষ নেতা আজ শনিবার কলকাতা থেকে দূরভাষে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘শাহ অবশ্যই টানা থাকবেন না। সংসদের তিন দিনের অধিবেশনের সময় তাঁকে দিল্লি থাকতে হবে। বারবার তিনি আসবেন। দু–তিন দিন থাকবেন। আবার আসবেন-যাবেন। পরিবর্তন ছাড়া এবার আমাদের দ্বিতীয় লক্ষ্য নেই।’
ওই নেতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেই লক্ষ্যের স্লোগান স্থির করে দিয়েছেন। নির্মম সরকার আর নেই দরকার।’
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল বা উত্তরবঙ্গে বিজেপির অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো। তাই শিলিগুড়ি ও বালুরঘাটের দুটি আসনে অমিত শাহ ঘাঁটি গাড়বেন। রাজ্য বিজেপি সূত্রে খবর, ওই সময় গোটা উত্তরাঞ্চলের ভোট মেশিনারি তৈরি করে দেবেন।
দক্ষিণবঙ্গে শাহ বেশি সময় কাটাবেন। হুগলি, দুর্গাপুর, খড়্গপুর, কলকাতা ও উত্তর চব্বিশ পরগনা বা নদিয়ার মতুয়া-অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থান করবেন। মূল নজর ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে অল্প ব্যবধানে হারা আসনগুলোতে।
অথচ বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারেও ভাতা বা ডোলের ছড়াছড়ি। মমতা যে ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকা দিচ্ছেন, মোদি সেখানে তিন হাজারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মোদি-শাহ বুঝেছেন, মমতাকে হারাতে হলে তাঁর অস্ত্রই ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই।
দিনভর জনসমাবেশ ও রোড শোর পর রাতে সাংগঠনিক রণকৌশলের ছক আঁকা হবে। রাজ্য বিজেপির ওই নেতার কথায়, ‘পালাবদলের সোনার সুযোগ এবারই।’
ভোটের মুখে মানুষকে নানা সুবিধা দেওয়ার রাজনীতি, যা নরেন্দ্র মোদির ভাষায় ‘রেউড়ি’, তা বিজেপি এবার আরও জোরালো করে চালাচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডোল-ভাতা নীতিকে সমালোচনা করেও বিজেপির ইশতেহারে ভাতা-ডোলের প্রতিশ্রুতি। মমতা যেখানে দুই হাজার টাকা দিচ্ছেন, মোদি তিন হাজারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
শুধু ভাতার যুদ্ধ নয়, ধারণা বদলের লড়াইয়েও মোদিকে নামতে হয়েছে। হিন্দি বলয়ে বিজেপি ও সংঘ পরিবার নিরামিষ ভক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে। হরিদ্বার পৌরসভায় মাছ-মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ করার আইন আসছে।
বিজেপির প্রার্থীদের দেখা যাচ্ছে প্রচারের সময় হাতে মাছ ঝুলিয়ে ভোটারদের আশ্বস্ত করতে। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হচ্ছে, তাঁরা রাজ্যে মাছের বন্যা বইয়ে দেবেন।
অযোধ্যাকেও নিরামিষ করে তোলা হচ্ছে। উত্তর ভারতের বহু শহরে সনাতন ধর্মীয় উৎসবে মাছ-মাংস নিষিদ্ধ। শ্রাবণ মাসে কাঁওয়ার যাত্রায় আমিষ দোকান বন্ধ। দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে মাছ-মাংস বিক্রি নিষিদ্ধের উদ্যোগ বিজেপির নেতারা নিয়েছিলেন, যদিও ব্যর্থ। বিহারের বিজেপি সরকার খোলা জায়গায় মাছ-মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচারে বলেন, ক্ষমতায় এলে তারা বাঙালির পাত থেকে মাছ-মাংস-ডিম তুলে দেবে। বিজেপি বুঝেছে, বাঙালির মন জিততে গোঁড়ামি চলবে না। তাই মোদিকে প্রচারে মাছের প্রসঙ্গ তুলতে হচ্ছে। বলছেন, ক্ষমতায় এলে মাছের জন্য ভিন রাজ্যের দিকে চেয়ে থাকতে হবে না। বিজেপির প্রার্থীরা হাতে মাছ ঝুলিয়ে প্রচার করছেন। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, রাজ্যে মাছের বন্যা বইয়ে দেবেন।
তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা স্বীকার করছেন, ২০২১ সালের লড়াই এবারের মতো ক্ষুরধার ছিল না। সেবার শুধু বিজেপি, এবার নির্বাচন কমিশনও বিজেপির সঙ্গে। জয়ের জন্য অমিত শাহর ১৫ দিন রাজ্যে থাকা।
তৃণমূল কংগ্রেস অমিত শাহকে স্বাগত জানিয়েছে ‘এক্স’ হ্যান্ডলে। ছবিসহ বাঙালি ব্যঞ্জনের তালিকা দিয়ে লেখা, ‘খুব ভালো কথা। বাংলা সব সময় পর্যটকদের দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে স্বাগত জানায়। আপনিও স্বাগত। এ রাজ্যে যত দিন খুশি থাকুন। অবস্থানকালে আমাদের অপূর্ব সুস্বাদু পদগুলোর স্বাদ গ্রহণ করতে ভুলবেন না।’ তালিকায় মুড়িঘন্ট, পাবদা মাছের ঝোল, ইলিশ ভাপা, চিংড়ির মালাইকারি, ভেটকি পাতুরি, কষা মাংস। ছবি ও পোস্ট বিজেপির উদ্দেশে বাঙালির সাংস্কৃতিক গর্বের খোঁচা।






