সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ কমান্ডাররা নিহত হলেও, সামরিক ঘাঁটি, কারখানা ও সেতু গুঁড়িয়ে গেলেও এবং অর্থনীতি বিপর্যস্ত হলেও ইরানের শাসকেরা বিশ্বাস করছেন, যুদ্ধের শুরুর চেয়ে তারা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছয় সপ্তাহের তীব্র হামলার পর এখন সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর। এমন পরিস্থিতিতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন আলোচনায় বসলেও নমনীয়তার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। বরং তারা নতুন কঠিন দাবিগুলো সামনে তুলেছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দিন ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “বিজয়কে সুপ্রভাত জানাই। আজ ইতিহাসের নতুন পাতা উন্মোচিত হলো। ইরানের যুগ শুরু হয়েছে।”
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও তাদের সমর্থকদের কাছে এই যুদ্ধে টিকে থাকাটাই বড় জয়। তারা মনে করে, বিশ্বের শক্তিশালী দুই সামরিক বাহিনীর হামলা মোকাবিলা করে তারা নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। ১৯৭৯ সালে যে ‘প্রতিরোধের আদর্শ’ নিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল, এই জয় সেই আদর্শকেই সত্যায়িত করেছে। দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অসন্তোষ থাকলেও শাসকেরা শক্তভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, “ইরান মনে করছে তারা দুই পরাশক্তিকে কাবু করতে পেরেছে।” তিনি আরও বলেন, ইরানের ধর্মতাত্ত্বিক শাসকদের কাছে এটি একটি ‘ঐশ্বরিক বিজয়’।
যুদ্ধের আগের তুলনায় এখন ইরান দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলেও তারা মনে করতে পারে। মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, হামলায় ইরানের বিমান ও নৌবাহিনী অনেকটা ধ্বংস হয়েছে। তবু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ যায়। ইরান চায় যুদ্ধের শেষে এই জলপথের ওপর তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকুক।
“পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও হরমুজ প্রণালি এখন বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এখন তারা আরও ভালো অবস্থানে থেকে দেনদরবার করতে পারবে।”জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি
গত জানুয়ারিতে ৪৭ বছরের শাসনের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছিলেন ইরানের নেতারা। দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী রক্তক্ষয়ী অভিযান চালায়। অর্থনীতি দ্রুত পতনের দিকে যাচ্ছিল এবং ইরানের মিত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলি হামলায় বিপর্যস্ত হয়। এতে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের মুখে পড়ে।
তবে ইরানের মিত্ররা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে বড় ক্ষয়ক্ষতি করেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষক করিম সাজাদপুর বলেন, “দুই মাস আগে বিশ্বজুড়ে খবর ছিল তেহরান নিজের দেশের মানুষকে হত্যা করছে। এখন খবর হলো, তেহরান সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে প্রতিরোধ করছে।”কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষক করিম সাজাদপুর
হামলার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে। সরকারের বিরোধীরাও ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে পারছেন না। আগে কেউ কেউ আশা করেছিলেন হামলায় শাসকেরা ক্ষমতাচ্যুত হবে। কিন্তু এখন তারা ভয় পাচ্ছেন, ধ্বংসস্তূপে পরিণত দেশে শাসকেরা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরবে এবং বিরোধীদের ওপর কঠোর দমন চালাবে।
ইরান বিশ্ব থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। দেশটির নতুন নেতারা হয়তো মনে করবেন টিকে থাকতে হলে আলোচনার চেয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া বেশি জরুরি। তারা হয়তো এখন পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রতিযোগিতায় নামবেন।
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো আলী আলফনেহ বলেন, “এই পরিস্থিতি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘উত্তর কোরিয়ায়’ পরিণত করবে। দেশটি কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, দরিদ্র ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠবে।”
যুদ্ধের আগেই ইরান অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। সেই কষ্ট থেকেই সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুরু হয়। এখন ধ্বংস থেকে পুনর্গঠন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিমান হামলায় ইস্পাত কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, উৎপাদন বন্ধ। খুচরা ব্যবসায় ধস নেমেছে, ছাঁটাই ও কাজ হারানোর ভয়। সরকারের কর আদায় কমবে। পুনর্গঠনের জন্য বন্ধু দেশও নেই, প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেছে।
ইরান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি বলেন, নেতারা নিজেদের দলের ভেতরেই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। অনেক কট্টরপন্থী যুদ্ধবিরতি মানতে চাননি। আলোচনায় ফল না হলে শাসনব্যবস্থায় বিভাজন দেখা দিতে পারে।
ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষই নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলে দাবি করছে। আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামনে সমঝোতা নয়, আরও যুদ্ধের আশঙ্কা। ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’-এর জ্যেষ্ঠ পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বিরোধগুলো এখন আরও জটিল হয়ে গেছে। এগুলো সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করা খুব কঠিন। তাই আজ হোক বা কাল, আরেক দফা লড়াইয়ে আশঙ্কা রয়েছে।”






