কাজী সালাহউদ্দিনের ১৬ বছরের যুগের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতির আসনে এসেছেন তাবিথ আউয়াল। সবাই আশা করেছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে দেশের ফুটবলে নতুন গতি আসবে এবং ঘরোয়া ফুটবল জেগে উঠবে। তাবিথ নিজেও স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? নাকি বাফুফে পুরোনো উদাসীনতার জালেই আটকে রয়েছে?

৯ নভেম্বর ২০২৪। ২৮টি আলোচ্যসূচি নিয়ে বাফুফের সভাপতি হিসেবে প্রথম সভায় বসেন তাবিথ আউয়াল। নির্বাচনে কোনো লিখিত ইশতেহার না থাকলেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এক ডজন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ‘সুপারস্টার’ ফুটবলার তৈরি, ডিজিটাল ক্লাব, জেলা ফুটবলে প্রাণ ফেরানোর মধ্যে ছিল অন্যতম। কিন্তু দেড় বছর পরও অনেক ফাঁক রয়ে গেছে হিসাবের খাতায়। ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য দেড় বছর বেশি সময় নয়, তবে ভিত্তি গড়তে এটি কমও নয়।

বাফুফের পরিকল্পনায় জেলা লিগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বাফুফের জেলা ফুটবল কমিটির প্রধান সাবেক ফুটবলার ইকবাল হোসেনের নিয়মিত লিগের প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ। কোন জেলায় কবে লিগ হয়েছে, খোঁজ নিতে গেলে হাবুডুবু খাওয়া যায়। বেশিরভাগ জেলার কর্মকর্তারা স্থানীয় লিগ ভুলে গেছেন। বাফুফের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে লিগ হয়েছে—চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, মাগুরা, সিলেট ও কিশোরগঞ্জ। বাকি জেলায় ফুটবলের অঘোষিত ‘কারফিউ’ চলছে।

অনেক জেলায় ১০-১২ বছর ধরে কোনো লিগ হয়নি। চাঁদপুরে ২০১৪ সালের পর থেকে লিগ নেই। ফরিদপুর ও কুমিল্লায় ২০২২ সালে সর্বশেষ হয়েছে। তৃণমূলের প্রাণকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে মাত্র চারটি লিগ হয়েছে, ২০১৮-এর পর একটিও নয়। জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএফএ) নিষ্ক্রিয়তা এবং বাফুফের ঢাকাকেন্দ্রিকতার জন্য এই অচলাবস্থা। কাজী সালাহউদ্দিনের সময় অনুদান দিয়ে লিগ চালানো হতো, তাবিথ যুগে তা দেখা যায়নি। নারায়ণগঞ্জ ডিএফএর সভাপতি শহীদ হোসেন স্বপন বলেছেন, “জেলার ফুটবলই না বাঁচলে বাফুফে আছে কিসের জন্য?”

ফুটবলারদের সংবর্ধনা হালকা হয়নি। ঢাকার পাইওনিয়ার লিগ থেকে মোনেম মুন্না, আরমান মিয়া, জুয়েল রানার মতো তারকা উঠে এসেছে। কিন্তু ২০২২ সালের পর এই লিগ বন্ধ। বাফুফে সদস্য টিপু সুলতানকে এক বছরের জন্য চেয়ারম্যান করা হয়, কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়নি। টিপু সুলতান মাঠ ও স্পনসরের অভাবের কথা বলেন। এতে আগামী খেলোয়াড় তৈরির কারখানা তালাবদ্ধ।

তাবিথ যুগে ঢাকায় একটি সিনিয়র ডিভিশন লিগ হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ লিগ ২০২৩ সালের পর বন্ধ। ছাদ সাজানোর আগে ভিত শক্ত করতে হয়। নিচের স্তরের লিগ না চললে নতুন ফুটবলার কোথা থেকে আসবে?

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের আকর্ষণ কমছে। সম্প্রচারের মান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তা খারাপ হয়েছে। লিগের দীর্ঘ বিরতি ফুটবলারদের ফর্ম নষ্ট করছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর শুরু ১০ দলের লিগে পরশু পর্যন্ত সাড়ে ছয় মাসে মাত্র ১১টি ম্যাচ হয়েছে। আগস্টে শুরু ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো ৩১টি করে ম্যাচ খেলেছে, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও জাতীয় দলের খেলা ছাড়াও।

ঢাকার বাইরের মাঠের মান নিয়ে ফুটবলারদের অভিযোগ। মাঠ সংস্কার ক্লাবের দায়িত্ব, কিন্তু তারা করে না। বাফুফের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। তাবিথ ক্লাবগুলোকে ডিজিটাল করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু দৃশ্যমান হয়নি। দীর্ঘ বিরতিতে ক্লাবগুলোর অবস্থা খারাপ। আশার কথা, ফুটবল লিগ গতকাল মাঠে ফিরেছে।

বাফুফের বর্তমান কমিটিতে বাণিজ্যিকীকরণ বেড়েছে। হাতিরঝিলে সংবর্ধনা, ছাদখোলা বাস, ইভেন্ট—এসব চলছে। সরকারি সহায়তায় অনূর্ধ্ব-১৫ হয়েছে, অনূর্ধ্ব-১৭ চলমান। মেয়েরা সাফ শিরোপা ধরে রেখেছে। প্রথম সাফ নারী ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন, মেয়েদের জাতীয় দল ও অনূর্ধ্ব-২০ দল এশিয়ান কাপে খেলেছে। কদিন আগে ছেলেদের অনূর্ধ্ব-২০ সাফ জয়।

জাতীয় দলে সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়েছে বাফুফে, ভালো খেলায় আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু হামজা চৌধুরী কাজী সালাহউদ্দিনের আমলে এসেছিলেন। শমিত, ফাহামিদুল, জায়ান, রোনানদের এনেছে বর্তমান কমিটি। প্রবাসী খোঁজায় আন্তর্জাতিক স্কাউটিং টিম গঠন করেছে। এটি অন্যের জমি থেকে ফসল আনার মতো, ভিত্তি শক্ত হয় না।

ফেডারেশনের মূল্যায়ন উন্নয়নমূলক কাজে। বাফুফের কমিটি এতে পিছিয়ে। ঘরোয়া লিগ, জাতীয় দলের ম্যাচ—এগুলো রুটিন। জেলা লিগ সচল, পাইওনিয়ার লিগে কিশোরদের অংশগ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার। তাবিথ আউয়াল সফল ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও সাবেক ফুটবলার। জেলা ফুটবল না ভাঙলে, তৃণমূল না চালু করলে বাফুফের নতুন যাত্রা দিশা পাবে কি না, সন্দেহ রয়েছে।