পবিত্র কোরআন পিতৃত্বকে মানুষের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গভীর বন্ধন হিসেবে স্বীকার করেছে। এই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত আছে বৈষয়িক এবং আধ্যাত্মিক বিভিন্ন অধিকার ও দায়িত্ব।

সন্তান যেমন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বড় নেয়ামত, তেমনি পিতৃত্ব একটি গুরুতর দায়িত্ব।

সৎকর্মশীলদের প্রার্থনা উদ্ধৃত করে কোরআন বলছে, “হে আমাদের প্রতিপালক, এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন, যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয়।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪)

কোরআন মাজিদে পিতৃত্ব সম্পর্কিত শব্দগুলো প্রায় ১১৭ বার এসেছে। কোরআনের প্রয়োগে ‘পিতা’ শব্দটি তিনটি অর্থে দেখা যায়:

আরবি ‘আব’ (পিতা) শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো প্রস্তুতি ও সংকল্প। আবার ‘ইবা’ বা ‘আব’ বলতে সুরক্ষা ও আশ্রয়কেও বোঝানো হয়।

পারিভাষিকভাবে পিতা হলেন তিনি, যার মাধ্যমে কোনো সত্তার অস্তিত্ব বা সংশোধন প্রকাশ পায়।

ভাষাবিদদের মতে, ‘আব’ শব্দটি ‘ওয়ালিদ’ অপেক্ষা ব্যাপক। ‘ওয়ালিদ’ বলতে কেবল জন্মদাতা পিতাকে বোঝানো হলেও ‘আব’ শব্দটি পিতা, দাদা এমনকি চাচার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়।

কোরআন মাজিদে পিতৃত্ব সম্পর্কিত শব্দগুলো প্রায় ১১৭ বার এসেছে। কোরআনের প্রয়োগে ‘পিতা’ শব্দটি তিনটি অর্থে দেখা যায়:

১. পিতা: “যেদিন মানুষ তার মা, বাবা ও ভাই থেকে পলায়ন করবে।” (সুরা আবাসা, আয়াত: ৩৪)

২. চাচা: নবী ইয়াকুব (আ.)-এর মৃত্যুকালে তাঁর সন্তানরা বলেছিল, “আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহের ইবাদত করব।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩৩)

এখানে নবী ইয়াকুবের চাচা ছিলেন হজরত ইসমাইল (আ.)।

৩. পূর্বপুরুষ: “তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের মিল্লাত বা আদর্শ।” (সুরা হজ, আয়াত: ৭৮)

কোরআন ‘আবওয়াইন’ (পিতা-মাতা) এবং ‘ওয়ালিদাইন’ (বাবা-মা) শব্দ দুটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ অলঙ্কার বজায় রেখেছে।

যখন উত্তরাধিকার বা নেতৃত্বের প্রসঙ্গ আসে, তখন পিতার সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়ে ‘আবওয়াইন’ বলা হয়।

অন্যদিকে যখন জন্মদান, লালন-পালন ও মমতা মুখ্য থাকে, তখন মায়ের ত্যাগকে সামনে রেখে ‘ওয়ালিদাইন’ বলা হয়। (ফাদেল সালেহ আস-সামাররাই, লামাসাত বায়ানিয়া, পৃষ্ঠা: ১৯৪, দার আম্মার, আম্মান: ২০০৩ খ্রি.)

বর্তমানে সমাজে প্রচলিত এই ধারণা যে—মাতা কেবল লালন-পালন করবেন আর পিতা কেবল অর্থ জোগাবেন—এর কোনো ভিত্তি কোরআনে নেই।

কোরআন থেকে পিতৃত্বের যে দর্শন পাওয়া যায়, তার কয়েকটি প্রধান দিক হলো:

শিক্ষক: কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী পিতাই হলেন সন্তানের প্রধান শিক্ষক। নবী নুহ, ইব্রাহিম, ইয়াকুব ও লোকমান (আ.)-এর ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায় যে সন্তানের নৈতিক ও আকিদাগত শিক্ষার ভার পিতার ওপর ন্যস্ত।

বর্তমানে সমাজে প্রচলিত এই ধারণা যে—মাতা কেবল লালন-পালন করবেন আর পিতা কেবল অর্থ জোগাবেন—এর কোনো ভিত্তি কোরআনে নেই।

ধৈর্য: পিতৃত্ব মানেই এক নিরন্তর ত্যাগ। নূহ (আ.) তাঁর অবাধ্য সন্তানের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন, ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের ষড়যন্ত্রের মুখেও ‘সুন্দর ধৈর্য’ (সবরুন জামিল) ধারণ করেছেন। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১৮)

পরামর্শ: কোরআন পিতাকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী (Patriarchal) হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং পিতা হবেন সন্তানের বন্ধু ও পরামর্শদাতা।

ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর ছেলেকে কোরবানি করার স্বপ্ন দেখলেন, তখন তিনি তা সরাসরি চাপিয়ে না দিয়ে ছেলের মতামত জানতে চেয়েছিলেন, “বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে জবাই করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল?” (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০২)

সম্মান: সন্তানের ওপর পিতার অধিকার এতটাই যে আল্লাহ নিজের ইবাদতের পরেই পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।

এমনকি সামারকান্দি লিখেছেন, যদি কোরআন বা অন্য কিতাবে পিতামাতার প্রতি সম্মানের কথা নাও থাকত, তবুও কেবল বিচারবুদ্ধি বা বিবেক দিয়েই এটি ওয়াজিব বা আবশ্যক বলে সাব্যস্ত হতো। (নাসর বিন মুহাম্মদ আস-সামারকান্দি, তানবিহুল গাফিলিন, পৃষ্ঠা: ১২৪, দার ইবনে কাসির, দামেস্ক: ২০০০)

কোরআনের দৃষ্টিতে পিতৃত্ব একটি মহান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একজন সফল পিতা কেবল সম্পদের জোগানদাতা নন, বরং তিনি সন্তানের আদর্শ, বন্ধু এবং পরকালীন পথের দিশারি।

কোরআনে নবী ইয়াকুবকে একজন অনুকরণীয় পিতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তাঁর চরিত্রে কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়:

১. সৎ বংশের প্রভাব: তিনি ইব্রাহিম ও ইসহাক (আ.)-এর মতো মহান নবীদের বংশধর। একটি শুদ্ধ পারিবারিক পরিবেশ যে যোগ্য পিতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে, তিনি তার প্রমাণ।

২. হালাল উপার্জন: তিনি কঠোর পরিশ্রমী মেষপালক ছিলেন। সন্তানদের অন্নের সংস্থান করতে তিনি মরুভূমিতে শ্রম দিয়েছেন।

৩. প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা: ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা যখন রক্তমাখা জামা নিয়ে এসে নেকড়ের গল্প শোনাল, তখন তিনি বিচলিত না হয়ে সত্য বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সন্তানদের সব সময় পরামর্শ ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিচালনা করতেন।

৪. অকৃত্রিম মমতা: নবী ইউসুফের বিরহে তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঘটনা প্রমাণ করে যে পিতার অন্তরে সন্তানের জন্য ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে।

৫. ক্ষমাশীলতা: সন্তানেরা তাঁর সঙ্গে অন্যায় করার পরও যখন তারা ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইল, তখন তিনি কঠোর না হয়ে বললেন, “আমি শীঘ্রই আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৯৮)

কোরআনের দৃষ্টিতে পিতৃত্ব একটি মহান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একজন সফল পিতা কেবল সম্পদের জোগানদাতা নন, বরং তিনি সন্তানের আদর্শ, বন্ধু এবং পরকালীন পথের দিশারি।