দীর্ঘদিন ধরে কলেরার বিশ্বব্যাপী বিস্তারের জন্য গঙ্গা ডেল্টা এবং বাংলাদেশকে দায়ী করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি জিনোমিক গবেষণা এই ধারণাকে খণ্ডন করেছে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, কলেরার বৈশ্বিক ছড়িয়ে পড়ার মূল চালিকাশক্তি কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং সমগ্র গঙ্গা অববাহিকা এবং ভারত। গবেষকরা বাংলাদেশ ও উত্তর ভারতের ২ হাজার ৩০০টির বেশি ভিব্রিও কলেরি ব্যাকটেরিয়ার জিনোম বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কলেরার জীবাণু আদান-প্রদান ঘটলেও গত দুই দশকে বাংলাদেশের স্ট্রেইনগুলো মূলত আলাদাভাবে বিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্ট্রেইনে বিশেষ ধরনের মোবাইল ডিএনএ উপাদানের দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যা ব্যাকটেরিওফেজ (ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণকারী ভাইরাস) থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের কলেরার লিনিয়েজে (যেমন বিডি১ এবং বিডি২) এমন কিছু অ্যান্টি-ফেজ সিস্টেম রয়েছে, যা তাদের আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে এই স্ট্রেইনগুলো দেশের সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর বিপরীতে, ভারতের লিনিয়েজে এই ধরনের সীমাবদ্ধতা কম থাকায় সেগুলো খুব সহজেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে কিছু ফেজ-ডিফেন্স সিস্টেম হারিয়ে যাওয়ার ফলে রোগীদের মধ্যে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে, যা সংক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, জীবাণুর ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা এবং এর জীবনঘাতী ক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্যের মতো কাজ করে।
এত দিন ধারণা করা হতো, গঙ্গা অববাহিকার নদীব্যবস্থা এবং পরিবেশগত মিশ্রণের মাধ্যমে কলেরা ছড়ায়। তবে নতুন এ তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। গবেষকদের মতে, পরিবেশের চেয়ে মানুষের চলাচল এবং জনসংখ্যার পরিবর্তনই এই রোগটি এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে কলেরার সপ্তম বৈশ্বিক মহামারি চলছে। সাধারণত বিশ্বজুড়ে কলেরার নিয়ন্ত্রণ–প্রচেষ্টা আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা হাইতির প্রাদুর্ভাবের ওপর গুরুত্ব দেয়। কিন্তু এই গবেষণা বলছে, যদি ভারতই কলেরার বৈশ্বিক উৎস হয়ে থাকে, তবে নজরদারি ও টিকাদান কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত গঙ্গা অববাহিকার হটস্পট।
গবেষকদের মতে, গঙ্গা অববাহিকায় সংক্রমণের উৎসগুলো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে চলমান এই বৈশ্বিক মহামারি শেষ করা সম্ভব হতে পারে। এই গবেষণা সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত হয়েছে।
সূত্র: নেচার






