হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসে কারিমা বিনতে আহমদ (রহ.) এক অবিস্মরণীয় নাম। ৩৬৩ হিজরিতে জন্মগ্রহণকারী এই মহান নারী ৪৬৩ হিজরি পর্যন্ত ১০০ বছর দীর্ঘ জীবন যাপন করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/১০৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৪০৭ হি.)
তাঁর সমগ্র জীবন জ্ঞান অর্জনেই উত্সর্গিত ছিল। বিশেষ করে ‘সহিহ বুখারি’র বিশুদ্ধতা রক্ষায় তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে অঙ্কিত।
জ্ঞান অন্বেষণে সফর ও মক্কায় বসবাস
সমকালীন মুহাদ্দিসদের নীতি অনুসরণ করে তিনি জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ যাত্রা করেন। খোরাসান ও বাগদাদ ভ্রমণ করেছেন। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৮/২৩৩, দারুল হাদিস, কায়রো: ২০০৬ খ্রি.)
বাবার সঙ্গে খোরাসানের বিখ্যাত শহর মার্ভ থেকে বাইতুল মাকদাসে গিয়ে তিনি সহিহ বুখারির শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী আবু হাইসাম কুশমিহানির কাছে কিতাবটি শোনেন। পরবর্তীতে বাবার সঙ্গে মক্কায় চলে আসেন এবং আমৃত্যু কাবার পাশে জ্ঞানচর্চা ও পাঠদানে নিমগ্ন থাকেন।
আলেমদের চোখে কারিমা
জীবনী ও ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে কারিমা বিনতে আহমদের জ্ঞান, মুখস্থশক্তি, নেতৃত্ব ও দুনিয়াবিমুখিতার প্রশংসা প্রচুর। তাঁর জীবনীকাররা একমত যে, তিনি ছিলেন মুহাদ্দিসা, মহীয়সী ও গভীর বুদ্ধিমতির অধিকারিণী।
বর্ণনা সংরক্ষণে তাঁর নিখুঁততা অতুলনীয় এবং হাদিসের সনদ ছিল উচ্চমানের। ইবনুল আহদাল তাঁকে ‘হাফিজা’ হিসেবে গণ্য করেছেন। বর্ণনাকারীরা তাঁর কাছ থেকে হাদিস শুনে বলতেন, “পুণ্যবতী কারিমা বিনতে আহমদ আল-মারওয়াজিয়া মক্কায় আমাদের নিকট হাদিস বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ একে (মক্কাকে) রক্ষা করুন।”
আবু বকর বিন মনসুর আস-সামআনি বলেন, “আমি আমার বাবা আবু মুজাফফর আস-সামআনিকে কারিমার কথা উল্লেখ করতে শুনেছি। তিনি বলতেন, কোনো মানুষ কি কারিমার মতো আর কাউকে দেখেছে?” (জাহাবি, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৮/২৩৩, দারুল হাদিস, কায়রো: ২০০৬ খ্রি.)
হাফেজ ইবনে জাওযি ৪৬৩ হিজরির ঘটনাবলীতে তাঁকে ‘আলেম ও সালেহা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইমাম জাহাবি আল-সিয়ার গ্রন্থে তাঁকে ‘বিদুষী শাইখা ও উচ্চ সনদের অধিকারিণী’ বলে অভিহিত করেছেন।
আল-সাফাদি বলেছেন, “মক্কায় অবস্থানকারিণী উম্মুল কিরাম ছিলেন একজন গুণবতী লেখিকা ও আলিমা। তিনি তাঁর পাণ্ডুলিপি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করতেন।” (সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফিয়াত, ২৪/২৫৪, দারু ইহয়ায়িত তুরাস, বৈরুত: ২০০০ খ্রি.)
সুযোগ্য ছাত্রবৃন্দ
উচ্চ সনদ ও মক্কা অবস্থানের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে আসতেন। তাঁর বিখ্যাত ছাত্ররা: ১. খতিব বাগদাদি—হাদিস শাস্ত্রের প্রবাদপুরুষ। ২. আবু মুজাফফর আস-সামআনি: বিখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস। ৩. আল-হুমাইদি: ‘আল-জামউ বাইনাস সহিহাইন’-এর লেখক। ৪. আবু তালেব আল-যাইনাবি: হানিফি মাজহাবের তৎকালীন প্রধান ব্যক্তিত্ব।
ইমাম জাহাবি উল্লেখ করেছেন, মরক্কো ও আন্দালুসিয়া থেকেও অসংখ্য মানুষ তাঁর কাছে হাদিসের পাঠ নিয়েছিলেন। (জাহাবি, তারিখুল ইসলাম, ১০/২২৩, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত: ১৯৯৩ খ্রি.)
সহিহ বুখারির ‘কারিমা সংস্করণ’
সহিহ বুখারির ইতিহাসে তাঁর নাম অবিচ্ছেদ্য। মুহাদ্দিসদের কাছে তাঁর কপি নুসখায়ে কারিমা বা কারিমা সংস্করণ নামে খ্যাত। ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে এই সংস্করণের উপর গভীরভাবে নির্ভর করেছেন।
৪৪৫ হিজরিতে হজে আসা খতিব বাগদাদি কারিমার কাছে পূর্ণ সহিহ বুখারি পাঠ করেন। আবু মাহদি আল-সালাবি বর্ণনা করেন, খতিব বাগদাদি মক্কায় মাত্র পাঁচ দিনে কারিমার কাছে পুরো বুখারি শরিফ পড়ে শেষ করেছিলেন। (ইবনে হাজার আসকালানি, আল-মুজামুল মুফাহরাস, পৃ. ৩৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৯৯৮ খ্রি.)
পাঠদানে কারিমা (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। তাঁর ছাত্র আবু আল-গানাইম আন-নারসি বলেন, “তিনি যখন আমাকে তাঁর বুখারির পাণ্ডুলিপি বের করে দিলেন, আমি তা থেকে সাতটি পৃষ্ঠা লিখলাম। আমি চেয়েছিলাম একা একা মিলিয়ে নিতে। কিন্তু তিনি বললেন—না, যতক্ষণ না আমার সাথে মিলিয়ে দেখবে (ততক্ষণ হবে না)।” (জাহাবি, তারিখুল ইসলাম, ১০/২২৩, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত: ১৯৯৩ খ্রি.)
কারিমা মারওয়াজিয়া (রহ.) নারী শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর একাগ্রতা ও আমানতদারিতার জন্য কয়েক শতাব্দী ধরে শ্রেষ্ঠ আলেমগণ সহিহ বুখারির বিশুদ্ধ পাঠ লাভ করেছেন। মক্কা শরিফে তিনিই প্রথম নারী হিসেবে সহিহ বুখারির দরস দিয়েছিলেন, যা জ্ঞানজগতে চিরস্মরণীয়।






