মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে দাবি করছিলেন তেহরান নিজেই শান্তি চাইছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে হোয়াইট হাউস সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য উদ্যমী হয়ে উঠেছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের ওপর চাপ দিচ্ছিল যাতে তারা ইরানকে বোঝানোর ব্যবস্থা করে যুদ্ধ থামায় এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়। পাকিস্তান মুসলিম দেশ এবং প্রতিবেশী হওয়ায় ওয়াশিংটন ভেবেছিল, তাদের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠালে ইরান সহজে মেনে নেবে।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এই গোপন তৎপরতা চালান। এর ফলে গত মঙ্গলবার রাতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। উল্লেখ্য, এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে কথা না মানলে তিনি ইরানের পুরো ‘সভ্যতা’ ধূলিসাৎ করবেন।
আসলে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এ ছাড়া ইরান যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তা-ও তাঁকে অবাক করে দিয়েছিল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী সংশ্লিষ্ট পাঁচটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, গত ২১ মার্চ থেকেই ট্রাম্প মনে মনে যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ছিলেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হতে যাওয়ার সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার ফোনে কথা বলেন। এরপর তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দুই সপ্তাহের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এই ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, এটি পাকিস্তানের নিজস্ব উদ্যোগ। কিন্তু তাঁর পোস্টে ভুল করে ‘খসড়া’ কথাটি থেকে গিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে বিবৃতিটি আসলে হোয়াইট হাউস আগে থেকেই লিখে দিয়েছিল।
ট্রাম্প প্রথম সময়সীমা বেঁধে দিলে জেনারেল আসিম মুনির ও পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তেহরানের নেতা ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে সেতুবন্ধন শুরু করেন। তারা প্রস্তাব দেন, শান্তির জন্য বড় বৈঠক ইসলামাবাদে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসানে ১৫ দফার খসড়া প্রস্তাব দেয়, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সেটি ইরানকে দেখান। বিনিময়ে ইরান ৫ ও ১০ দফার ফিরতি প্রস্তাব দেয়।
মাঝখানে ৪৫ দিন থেকে ২ সপ্তাহ—নানা মেয়াদ নিয়ে আলোচনা চলে। দুই পক্ষ শুরুতে দাবিতে অটল থাকলেও পরে ইরান মজুত ইউরেনিয়ামের পরিমাণ কমাতে কিছুটা রাজি হয়।
এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় হামলার পর ইরানের রাজনৈতিক নেতারা কয়েক দিন আগে হরমুজ প্রণালী খোলার বিনিময়ে যুদ্ধবিরতিতে নীতিগতভাবে রাজি হন। কিন্তু সমস্যা হয় ইরানের শক্তিশালী বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) রাজি করানো। তাদের ভিতর মতভেদ ছিল, কিছু অংশ যুদ্ধ থামাতে বা প্রণালী ছাড়তে রাজি ছিল না। এমনকি গত মঙ্গলবার সৌদি আরবের জুবাইল এলাকায় ড্রোন হামলা হয়। একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তার মতে, এটি শান্তি আলোচনা নষ্ট করার শেষ চেষ্টা।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকায় ইসলামাবাদ এতে ক্ষুব্ধ হয়। তারা তেহরানকে জানায়, এমন হামলা চললে শান্তি চেষ্টা ব্যর্থ হবে এবং ইরান বিশ্ব থেকে একা পড়বে। উল্লেখ্য, সৌদি আরবে বারবার হামলা সত্ত্বেও পাকিস্তান যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে এসেছে।
গতকাল বিকেলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিশ্চিত করেন, আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে প্রতিনিধি পাঠাবেন।
পাকিস্তানি কূটনীতিকেরা আশা করছেন, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জেডি ভ্যান্স ও স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও আইআরজিসির শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, শান্তিপ্রক্রিয়া নষ্ট করার মতো ‘অনেক বাধা’ এখনো রয়ে গেছে। ইসরায়েল লেবাননে বেপরোয়া হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়বে না। ইসলামাবাদ সন্দেহ করছে, আইআরজিসির কিছু অংশ পারস্য উপসাগরের স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি নষ্ট করতে পারে।
গতকাল বিকেলে জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ধন্যবাদ জানান। তবে ইরান সরকারের তথ্যমতে, আরাগচি সেই কথায় ‘ইরান ও লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ বিষয়টিও তুলে ধরেন।
দুজন পাকিস্তানি কর্মকর্তার মতে, ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের কিছু বিষয়ে পাকিস্তানেরও আপত্তি আছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর একক নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজ থেকে টোল আদায়ের বিষয়ে।
পুরো পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি বলেছেন, গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে পাঁচ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করে চীন জট খুলতে সাহায্য করেছিল। এটি হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে গত মঙ্গলবারের চুক্তিতে বেইজিং সরাসরি তেহরানকে চাপ দিয়েছে কি না, তার প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। মঙ্গলবার এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তা–ই শুনছি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইরান চীনের কাছ থেকে বেশি সমর্থন আশা করেছিল কিন্তু চীন পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিল। ওই দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বড় ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকায় তারাও যুদ্ধবিরতি চেয়েছিল।






