ঢাকার আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের পাশে গাছের ছায়ায় বসে গল্প করছিলেন মোহাম্মদ ইউসুফ ও চিরঞ্জিত মুন্ডা। দুজনেই গাড়িচালক। তাঁদের আগে পরিচয় ছিল না, তেল নিতে এসে হয়েছে। জ্বালানি তেলের অপেক্ষাই এই পরিচয়ের সূত্র।
বুধবার বেলা দেড়টার দিকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই অপেক্ষা চলছে ২৪ ঘণ্টারও বেশি। গতকাল বেলা একটার দিকে গাড়ি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন দুজন। এখনো তেল পাননি। তখন তেল পাওয়ার সুযোগও ছিল না, কারণ তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল নেই বলে বিক্রি বন্ধ। তবু গাড়ির লাইন ছিল। ইউসুফ ও চিরঞ্জিতের গাড়ি ছিল সেই লাইনে ২০-২২ নম্বর পেছনে। ডিপো থেকে তেল আসার অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা।
এই অপেক্ষার সময় গল্প করে কাটাচ্ছেন ইউসুফ ও চিরঞ্জিত। কখনো ইউসুফের গাড়িতে, কখনো চিরঞ্জিতের গাড়িতে বসে গল্প। আবার পাশের ফুটপাতেও সময় কাটান। রোদ এড়াতে গাছের ছায়ায় বসছেন। একটি রাত, একটি তেলের পাম্প, শত শত মানুষের নির্ঘুম অপেক্ষা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের যে সংকট তৈরি করেছে, তার ভুক্তভোগী এই ইউসুফ ও চিরঞ্জিতের মতো গাড়িচালকেরা। সংকটের আশঙ্কায় জ্বালানি কেনা বেড়েছে, ফিলিং স্টেশনগুলো চাহিদা মেটাতে পারছে না। মজুতও হচ্ছে। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন নিত্যদিনের চিত্র।
ইউসুফ মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ পাশে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গাড়ি নিয়ে সারিতে দাঁড়ান। খামারবাড়ি হয়ে সংসদ ভবন ও জিয়া উদ্যানের মাঝের লেক অ্যাভিনিউ পথে আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে আসতে হয়।
ইউসুফ বলেন, ১২ ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়ানোর পর রাত প্রায় আড়াইটার দিকে শোনেন পাম্পের তেল শেষ। তখন তাঁর গাড়ি গণভবন মোড়ের কাছাকাছি। তেল ফুরিয়ে বিক্রি বন্ধ হলে কিছু গাড়ি চলে যায়। তখন সামান্য এগোনোর সুযোগ পান। পুরো রাত ঝড়-বৃষ্টিতে গাড়ির ভেতরে কখনো বসে, কখনো শুয়ে কাটান।
দুপুরে রাস্তার উল্টো দিকের ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি দেখা গেলেও ইউসুফ সেখানে যাননি। জিজ্ঞাসায় তিনি বলেন, ‘ওখানেও লম্বা লাইন। এখানে এতক্ষণ অপেক্ষা করে জায়গা করেছি, ছেড়ে গেলে আবার শত শত গাড়ির পেছনে দাঁড়াতে হতো। আবার তেল পাব কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই।’
চিরঞ্জিত গতকাল বেলা দুইটায় লাইনে দাঁড়ান। তাঁর গাড়ি ইউসুফেরটির চেয়ে কয়েকটি আগে। পরে দাঁড়িয়ে ইউসুফের আগে যাওয়ার কারণে তিনি বলেন, রাতে বিক্রি বন্ধে অনেক গাড়ি চলে যায়। তখন সারি কিছুটা এগিয়ে যায়, কারণ কিছু চালক গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
চিরঞ্জিতের গাড়ির মালিক রাতে বাসায় যেতে বললেও তিনি যাননি। তিনি বলেন, ‘তখন আমিই স্যারকে (গাড়ির মালিক) বলেছি, অপেক্ষা করব। তখন স্যার বলেছেন, তুমি চাইলে অপেক্ষা করো।’ চিরঞ্জিতের গাড়িতে তেল মাত্র তিন-চার লিটার। এতে বড়জোর ৩০ কিলোমিটার চলবে, কিন্তু প্রতিদিন ৩৫ কিলোমিটার চালাতে হয়। চৈত্রের দুপুরে ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পেলেন ২০০ টাকার তেল। ছয় দিন আগে গত বৃহস্পতিবার তালুকদার ফিলিং স্টেশন থেকে তিন হাজার টাকার তেল নিয়েছিলেন বলে জানান চিরঞ্জিত।
ইউসুফ ও চিরঞ্জিত জানান, তাঁদের সামনে-পেছনে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরাও আগের দিন দুপুর বা বিকেল থেকে অপেক্ষা করছেন। দুপুরে ক্লান্ত হয়ে কেউ গাড়িতে ঘুমোচ্ছেন, কেউ ফুটপাতে মোবাইলে গেমস খেলে বা ভিডিও দেখে সময় কাটাচ্ছেন। ক্লান্তি, বিরক্তি, অনিশ্চয়তা—এক নিঃশব্দ দুর্ভোগের চিত্র।
বেলা দেড়টায় তালুকদার পাম্পে তেল কেনার জন্য গাড়ির সারি সোয়া দুই কিলোমিটার দীর্ঘ। ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট কাভার্ড ভ্যান মিলিয়ে ৩২৭টি গাড়ি। সারি গণভবন মোড়, লেক ড্রাইভ সড়ক হয়ে খামারবাড়ি মোড় পর্যন্ত। মোটরসাইকেল ৬৩টি। অনেক মোটরসাইকেলচালক বিক্রি বন্ধ দেখে অন্য পাম্পে চলে যান।
তেল ফুরিয়ে রাত দুইটায় বিক্রি বন্ধ হয় বলে জানান তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক তন্ময় বাড়ৈ। তিনি আজ দুপুরে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের গাড়ি তেলের জন্য ডিপোতে গেছে। তেল নিয়ে আসলেই বিক্রি শুরু করা হবে।’ ডিপো থেকে ১৩ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন ও ৪ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল আসছে। বিক্রি শুরু বিকেল পাঁচটায় হতে পারে বলে ধারণা দেন তিনি।
বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে চিরঞ্জিত মুন্ডা বলেন, ‘পাম্পে গাড়ি এসেছে। তেল নামানোর পর হয়তো বিক্রি শুরু হবে।’ ৫টা ১৬ মিনিটে তিনি জানান বিক্রি শুরু হয়েছে। ১৫ ঘণ্টা নিশ্চল সারি তখন এগোতে শুরু করে।
আসাদ গেটের তালুকদার পাম্পের উল্টোদিকে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন। দুপুরে সেখানে তেল বিক্রি চলছিল। মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য উল্টো দিকে এক লেনের সারি, গণভবন মোড় হয়ে মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোড হয়ে স্যার সৈয়দ রোড পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার। দুপুরে ১৩২টি ব্যক্তিগত গাড়ি। মোটরসাইকেল সারি ২১৮টি, ইকবাল রোডের বায়তুস সালাম জামে মসজিদ সামনে পর্যন্ত পৌনে এক কিলোমিটার।
সোনার বাংলা পাম্পের সারিতে মোটরসাইকেলচালক সোহেল রানা। বেলা দুইটায় তিনি পাম্প থেকে ১০০ মিটার দূরে আসাদ গেট মোড়ে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সকাল ১০টার একটু আগে থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। চার ঘণ্টা বাইক ঠেলে এসেছি। আরও কতক্ষণ লাগবে জানি না। কিন্তু শরীরে আর কুলাচ্ছে না।’ ‘অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি’
যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট, আজ সকালে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। তাতে সংকট কাটার আশা দেখছেন অনেকে।






