দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এতদিন মূলত মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলই পরিশোধন করা হতো। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে অপরিশোধিত তেলের জাহাজ না আসায় এখন শোধনাগারটির উৎপাদন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে তেল শোধনের সম্ভাবনা নিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি যাচাই-বাছাই শুরু করেছে।
প্রাথমিক পরীক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে ইস্টার্ন রিফাইনারি নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়া—এই চার দেশের তেলকে ‘পরিশোধনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব দেশের ‘বনি ক্রুড’, ‘মালয়েশিয়ান ব্লেন্ড’, ‘আলবেইন ব্লেন্ড’ ও ‘আলজেরি ক্রুড’-এর বৈশিষ্ট্য পরীক্ষায় দেখা গেছে, এগুলো বর্তমান শোধনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) পাঠানো হয়েছে। এরপরই মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন তেল কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা চলতি মাসেই দেশে পৌঁছানোর কথা।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ‘মারবান ক্রুড’ পরিশোধন করা হয়। এই দুই উৎসের তেল থেকে পেট্রল, অকটেন, ডিজেলসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি উৎপাদিত হয়। বছরে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল শোধনের সক্ষমতা রয়েছে এই সরকারি সংস্থার।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শরীফ হাসনাত বলেন, “নতুন এই উৎসগুলোর তেলের বৈশিষ্ট্য বর্তমানে ব্যবহৃত তেলের কাছাকাছি। ফলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়েই সেগুলো পরিশোধন করা সম্ভব হবে। এ কারণেই চারটি দেশের তেল নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।”
* মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন তেল আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
* ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৪–১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল শোধন করতে পারে।
* দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৮০% পরিশোধিত, যা সরাসরি আমদানি করা হয়।
আগে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়া অপরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তাব দিলেও তার নমুনা পরীক্ষায় ঘনত্ব বেশি দেখা গিয়ে দেশীয় অবকাঠামোতে পরিশোধন সম্ভব হয়নি।
আমদানিতে যুদ্ধের ধাক্কা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা করায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, যা বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিকে অনিশ্চিত করে তোলে। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে একটি জাহাজ আটকে যায়। ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল আনতে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ২৫ মার্কিন ডলার খরচ হয়। ইউএই-এর আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে জেবেল ধানা বন্দরের তেল আনার জন্য বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিপিসি) ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ জাহাজ ভাড়া করলেও চুক্তি বাতিল হয়। বিকল্প ফুজাইরা বন্দর ব্যবহারে আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে বলে বিপিসির কর্মকর্তারা জানান। এতে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর সুবিধা হবে।
মজুত কমে বাড়ছে চাপ
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিশোধিত, যা সরাসরি আমদানি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকার ৪৭ লাখ টন পরিশোধিত তেল ও ১৫ লাখ ১০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল (১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা) আমদানি হয়েছে, যার বড় অংশ সৌদি আরব ও ইউএই থেকে। গত অর্থবছরে স্থানীয় কনডেনসেট ও ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে ১৪ লাখ ৯৬ হাজার টন জ্বালানি উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে সাড়ে ৭ লাখ টন ডিজেল।
নতুন এই উৎসগুলোর তেলের বৈশিষ্ট্য বর্তমানে ব্যবহৃত তেলের কাছাকাছি। ফলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়েই সেগুলো পরিশোধন করা সম্ভব হবে। এ কারণেই চারটি দেশের তেল নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।মো. শরীফ হাসনাত, এমডি, ইস্টার্ন রিফাইনারি
চলতি বছরে উৎপাদনে ধাক্কা লাগার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। শোধনাগারের সংরক্ষণসক্ষমতা ২ লাখ ২৫ হাজার টন হলেও এপ্রিলের শুরুতে ব্যবহারযোগ্য মজুত নেমে এসেছে ১৯ হাজার টনে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ হাজার টন শোধনের সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন কমাতে হয়েছে। বর্তমান মজুত দিয়ে আরও চার–পাঁচ দিন চলবে বলছেন কর্মকর্তারা।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, চলতি মাসে মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসার কথা রয়েছে। মাসের শেষে সৌদি আরব থেকে একটি জাহাজও রওনা দেবে। ফলে আপাতত বড় সংকট হবে না বলে তাঁরা আশা করছেন।






