আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে গণপরিবহন খাতে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই খাতের সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, স্কুলের জন্য বৈদ্যুতিক বাস আমদানিতে আরোপিত শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই, রাস্তায় নতুন গাড়ি আসুক।”
সোমবার মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে পরিবহন খাতের সাতটি সংগঠনের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। একই দিন বিকেলে কৃষি খাতের ১০টি সংগঠনের সঙ্গে বাজেট আলোচনা করে এনবিআর। এই দুই খাতের সংগঠনগুলো তাদের বিভিন্ন প্রস্তাবনা ও করছাড়ের দাবি তুলে ধরে।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন কীটনাশকের কাঁচামাল আমদানিতে আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানায়। সংগঠনটি অভিযোগ করে, একটি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার জন্য কৃষি খাতের কীটনাশকের প্রস্তুত পণ্য আমদানিতে মূসক না থাকলেও কাঁচামাল আমদানিতে মূসক দিতে হয়। সংগঠনটির সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রস্তুত পণ্যে ৮ শতাংশ শুল্ক থাকলেও কাঁচামাল আমদানিতে দিতে হয় ৫৮ শতাংশ। তাই কাঁচামাল আমদানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে এবং অনেক পণ্য দেশে উৎপাদন করা যায় না। কাঁচামালে শুল্ক প্রত্যাহার হলে দেশেই ৯০ শতাংশ কীটনাশক উৎপাদন সম্ভব। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “এটা মারাত্মক অভিযোগ। প্রস্তুত পণ্যে না থাকলে, কাঁচামালে কেন মূসক থাকবে? এটা আমরা দেখব। আমরা চাই দেশেই এসব পণ্য উৎপাদন হোক।”
গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক বলেন, গাড়ির নিবন্ধন কমে যাচ্ছে। বেশি করের কারণে মধ্যবিত্তরা গাড়ির কাছে যেতে পারছে না। তাই সম্পূরক শুল্ক কমানোর দাবি জানান তিনি। সংগঠনটি প্ল্যাগইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে শুল্কহার ৫০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার ডিস্ট্রিবিউটর অ্যান্ড এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম তেল পরিবহনের ট্যাঙ্কলরি আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানান। তিনি কমপক্ষে ৫০০টি গাড়ি আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার চান। জনস্বার্থে বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিউর রহমান মোটরসাইকেলে সিএনজি ব্যবহারের অনুমতি চান। তিনি বলেন, “ছয় মাস চালিয়ে আমরা পরীক্ষা করেছি।” সংগঠনটি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্কহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার দাবি করে। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, দেশে গ্যাস নেই, এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রহণের পরামর্শ দেন।
অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় প্রতি লিটারে ১৮ টাকার বদলে এখন ৪২ টাকা কর দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আগের হার পুনর্বহালের দাবি জানান তিনি। সংগঠনটি হেলিকপ্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৩৭ শতাংশ শুল্কের বদলে আগের মতো ১০ শতাংশ বহাল করার দাবি করে। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, রাজস্ব আদায় এবার চার লাখ কোটি থেকে ছয় লাখ কোটি টাকা করতে হবে। তাই শুল্ক খুব বেশি কমানোর সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ প্যাসেঞ্জার ক্যারিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বদিউজ্জমান বাদল যাত্রীদের কর কমানোর দাবি জানান।
ফল আমদানিতে বেশি শুল্ক থাকায় ব্যবসা কমছে বলে জানায় বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, চোরাচালানের মাধ্যমে অনেক ফল দেশে আসছে। কারণ, শুল্কহার ২৫ শতাংশ, আরডি বা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কহার ২০ শতাংশ। মূসক ১৫ শতাংশ। শুল্ক–কর অনেক বেশি হওয়ায় মানুষ এখন ফল কিনতে পারছে না। ফলকে বিলাসপণ্য বলা হচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, করহার কমালেও কেউ কর দিতে চায় না। বলে আরও কমান। পরে বলে শূন্য করেন। তারপর বলে এখন ভর্তুকি দেন। শেষে আবার ভর্তুকি বাড়ানোর দাবি জানায়। অর্থাৎ কর কমলে, আদায় বাড়ে, এমনটা বাস্তব না। রমজান মাসে অনেক সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন করপোরেট করহার কমানোর দাবি জানায়। সংগঠনটির সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী করপোরেট করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার দাবি জানান। এ ছাড়া কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেন তিনি। সংগঠনটির মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, খামারিদের বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হচ্ছে। ৭০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে খাদ্যে। তাই লাভ না পেয়ে খামারিরা ব্যবসা ছেড়ে চলে গেলে সেই জায়গা দখলে নেবে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো।
ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের মহাসচিব মো. আনোয়ারুল হক বলেন, “ফিড তৈরিতে আমাদের ৭০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। তাই আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক।” এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এটা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হবে। সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ইহতেশাম বি শাহজাহান বলেন, “কম করে হলেও আমাদের এক হাজার কোটি টাকার অগ্রিম আয়কর এনবিআরে পড়ে আছে।” তাঁরা ন্যায়্যতার ভিত্তিতে কর দিতে চান বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ কৃষি যন্ত্রপাতিতে মূসক অব্যাহতির দাবি জানায়। সংগঠনটির সভাপতি আলীমুল এহসান চৌধুরী বলেন, অনেক নতুন কৃষিযন্ত্র এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। নতুন নতুন বিনিয়োগ আসছে। কিন্তু তালিকায় এসব যন্ত্র অন্তর্ভুক্ত না থাকায় মূসক ছাড় পাওয়া যাচ্ছে না।






