নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে তথ্য পকেটে নিয়ে ঘুরার কথা ভাবলে মনে পড়ত পাতলা চৌকো ফ্লপি ডিস্ক। কিন্তু এটি ছিল খুবই ভঙ্গুর, ধারণক্ষমতা মাত্র ১.৪৪ মেগাবাইট এবং দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত। অন্যদিকে সিডি ছিল আকারে বড় এবং একবার তথ্য লিখলে তা মুছে আবার ব্যবহার করা ঝামেলার কাজ। ঠিক এই পটভূমিতে তৈরি হয় তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসের অন্যতম সেরা উদ্ভাবন ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ, যা আজ আমরা পেন ড্রাইভ বা থাম্ব ড্রাইভ বলে জানি। তবে এই ছোট যন্ত্রের আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখনও বিতর্ক ও আইনি লড়াই চলছে। কোনো একক ব্যক্তির নয়, ইসরায়েল, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও চীনের বেশ কয়েক উদ্ভাবক ও প্রতিষ্ঠান একই সময়ে এর বিকাশ ঘটিয়েছে।
ইউএসবি ড্রাইভের ইতিহাস শুরু আশির দশকে। তোশিবার প্রকৌশলী ফুজিও মাসুয়োকা ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ফ্ল্যাশ মেমোরি আবিষ্কার করেন। এটিই ছিল পরবর্তী পোর্টেবল স্টোরেজ ডিভাইসের মূল ভিত্তি। তবে এই মেমোরিকে ইউএসবি পোর্টের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবহারযোগ্য করার কৃতিত্ব নিয়ে বিভিন্ন দাবি উঠেছে। ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবি ইসরায়েলের এম-সিস্টেমস প্রতিষ্ঠানের। প্রকৌশলী ডোভ মোরানের নেতৃত্বে তারা ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে ‘ডিস্ক অন কি’ নামক ডিভাইসের পেটেন্ট আবেদন করে। ২০০০ সালে তারা এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে নিয়ে আসে। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকেই পৃথিবীর প্রথম বাজারজাত ফ্ল্যাশ ড্রাইভ বলে স্বীকৃতি দেন। এটি সরাসরি ইউএসবি পোর্টে লাগত এবং কোনো ব্যাটারির প্রয়োজন হতো না।
একই সময় সিঙ্গাপুরের ট্রেক ২০০০ ইন্টারন্যাশনাল তাদের থাম্ব ড্রাইভ বাজারে আনে এবং ২০০০ সালে বড় আকারে বাণিজ্যিকভাবে বিপণন শুরু করে। তাইওয়ানের ফাইসন ইলেকট্রনিক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা, মালয়েশিয়ায় জন্মগ্রহণকারী পুয়া খেইন-সেং নিজেকে এর উদ্ভাবক বলে দাবি করেন। ২০০০-০১ সালে তিনি বিশ্বের প্রথম সিঙ্গেল-চিপ ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ কন্ট্রোলার তৈরি করেন। এর আগে একাধিক চিপ লাগত, যা ব্যয়বহুল ও বড় আকারের ছিল। পুয়ার উদ্ভাবন এটিকে ছোট ও সস্তা করে। চীনের নেটাক টেকনোলজি ১৯৯৯ সালে ইউএসবি ফ্ল্যাশ মেমোরি স্টোরেজের পেটেন্ট দাবি করে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর চীনের আদালত তাদের অনেক পেটেন্ট বহাল রাখে, ফলে তারা এ অঞ্চলের প্রধান উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত। ঐ সময় আইবিএমের কর্মচারী শিমোন শমুয়েলি মার্কিন পেটেন্ট অফিসে একটি ইনভেনশন ডিসক্লোজার জমা দেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আইবিএম ও এম-সিস্টেমস যৌথভাবে প্রথম দিকের ফ্ল্যাশ ড্রাইভ তৈরি করেছিল।
২০০০ সালের দিকে যখন প্রথম ফ্ল্যাশ ড্রাইভ বাজারে আসে, তখন এর ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ৮ মেগাবাইট। সে সময়ের ফ্লপি ডিস্কের তুলনায় এটি বড় উন্নতি হলেও আজকের মাপকাঠিতে নগণ্য। মাত্র দুই দশকে এর অবিশ্বাস্য উন্নয়ন ঘটেছে। এখন ৫১২ গিগাবাইট থেকে ২ টেরাবাইট ধারণক্ষমতার পেন ড্রাইভ পাওয়া যায়। আধুনিক ফ্ল্যাশ ড্রাইভগুলো টাইপ-সি, লাইটনিং বা ইউএসবি ৩.২ প্রযুক্তিতে কাজ করে এবং চোখের পলকে বড় তথ্য আদান-প্রদান করে।
সূত্র: ব্রিটানিকা






